কোয়ারি আবার ইজারার উদ্যোগ
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ০৩:১৭ PM

কোয়ারি আবার ইজারার উদ্যোগ

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫/০৬/২০২৬ ১২:২৩:১১ PM

কোয়ারি আবার ইজারার উদ্যোগ


নিয়মের বাইরে গিয়ে আগ্রাসী উত্তোলন ও পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কায় দেশের ৫১টি বালু ও পাথরের খনিজ কোয়ারির ইজারা কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, ইজারা বন্ধ থাকলেও বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন থেমে নেই। ফলে একদিকে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীন উত্তোলনের কারণে পরিবেশগত ক্ষতিও অব্যাহত রয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে খনিজ সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে নতুন করে শৃঙ্খলার আওতায় আনতে দেশের খনিজ কোয়ারিগুলো পুনরায় ইজারা দেওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে সরকার।

এ লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সভাপতি করে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে খনিজ সম্পদ, পরিবেশ, ভূমি, স্থানীয় সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে| তারা ইতোপূর্বে কিছু সুপারিশও করেছে। খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর সূত্রে জানা যায়, সরকারের ৫১টি খনিজ কোয়ারি এখন ইজারা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। পরিবেশগত ছাড়পত্র পেলেই ইজারা আহ্বান করা হবে।

খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর মহাপরিচালক কাজী জিয়াউল বাসেত বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে কমিটি হয়েছে, সেখান থেকে সুপারিশ এসেছে আমরা সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে কাজ করছি। এ ছাড়া খনিজ কোয়ারিগুলো ইজারা বন্ধ রাখার বিষয়টি নতুন করে আবার চালু হওয়ার অপেক্ষায়। পরিবেশগত এসেসমেন্ট হচ্ছে। পরিবেশের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। যে কোয়ারিগুলো ইজারা দিলে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না, সেগুলো দ্রুতই ইজারা উদ্যোগ গ্রহণ করবে সরকার।

কোথায় রয়েছে খনিজ কোয়ারি?
বাংলাদেশে প্রধানত সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর এবং চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় পাথর ও বালুর খনিজ কোয়ারি রয়েছে। উল্লেখযোগ্য কোয়ারিগুলোর মধ্যে রয়েছে সিলেটের ভোলাগঞ্জ, জাফলং, বিছনাকান্দি ও কোম্পানীগঞ্জ এলাকার পাথর কোয়ারি। এ ছাড়া সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও বারিকটিলা অঞ্চল, নেত্রকোনার দুর্গাপুর এলাকার সাদা মাটিসংলগ্ন খনিজ এলাকা, শেরপুরের সীমান্তবর্তী বালুমহাল ও পাথরসমৃদ্ধ অঞ্চল।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অধিকাংশ পাথর কোয়ারি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এবং এগুলো নির্মাণ খাতের একটি প্রধান কাঁচামালের উৎস।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ইজারা কার্যক্রম চালু থাকলে সরকার প্রতিবছর কয়েকশ কোটি টাকার রাজস্ব পেতে পারে। অতীতে বিভিন্ন সময় বালুমহাল ও পাথর কোয়ারি থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় কয়েকশ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। তবে ইজারা বন্ধের পর এ খাতের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

তবে পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, অতীতের মতো নির্বিচারে পাথর উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হলে নদী, পাহাড়, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে| বিশেষ করে জাফলং, ভোলাগঞ্জ ও বিছনাকান্দি এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত পাথর উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, মৎস্যসম্পদ এবং পর্যটন পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

তাদের মতে, ইজারা পুনরায় চালু করা হলেও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, আধুনিক খনন পদ্ধতি, জিপিএস-ভিত্তিক নজরদারি এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

ইজারা বন্ধ সমাধান নয়- মনে করেন নীতিনির্ধারকরা
ভূতত্ত্ব ও খনিজ সম্পদ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইজারা বন্ধ করে রাখলেই পরিবেশ রক্ষা হয় না। বরং অবৈধ উত্তোলন বন্ধে কার্যকর মনিটরিং, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং স্বচ্ছ ইজারা ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন| তাদের ভাষ্য, ইজারা চালু হলে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে; নির্মাণ খাতে কাঁচামালের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে; অবৈধ উত্তোলন কমবে; স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে; পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ নিশ্চিত করা সহজ হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গঠিত কমিটি দেশের ৫১টি খনিজ কোয়ারির পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিয়েছে| সেই সুপারিশের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে কোয়ারিগুলো ইজারা দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে|

নীতিনির্ধারকদের মতে, খনিজ সম্পদ দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ| তাই রাজস্ব আয় ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে একটি টেকসই ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খনিজ কোয়ারি পরিচালনাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন কোয়ারিগুলো ইজারা না থাকায় সমস্যা রয়েছে। তদের মতে, এতে করে বালু বা পাথর জমে নদী বা লেকের গতিপথ বদলে যেতে পারে| আর ইজারা থাকলে ইজারাদারের লোকজন অনেক ক্ষেত্রে এসব দেখভাল করে। তবে সরকারের দায়িত্বশীল লোকদের সব সময় মনিটর করতে হবে। যাতে ইজারার চুক্তি ভঙ্গের ঘটনা না ঘটে।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর