ক্যাবের ব্যানারে সিলেটের রাজপথে নেমেছেন স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের দোসর জামিল চৌধুরী। বহুরূপী জামিল চৌধুরী কনজুমারস্ এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সিলেট জেলা কমিটির সভাপতি। গত ২ ডিসেম্বর সকালে খোলস বদলে সিলেটর রাজপথে নেমেছিলেন দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীদের কারসাজি ও অতি মুনাফা লাভের কারণে আলু ও পেঁয়াজসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে এক মানববন্ধনে। অত্যন্ত ধূর্ত ও চতুর এই লোকটি খোলস বদলান সরকারের পট পরিবর্তন হলেই।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছেন তার নতুন তৎপরতা। অথচ তিনি ছিলেন পতিত স্বৈরশাসকের সহযোগী প্রশাসনের আমলাদের দোসর। জামিল চৌধুরী সব সরকারের আমলেই থাকেন স্থানীয় প্রশাসনসহ সচিবলায়ের আমলাদের কাছাকাছি। যে সরকারই আসে তার মদদপুস্ট হয়ে কামাই করেন কাড়ি কাড়ি টাকা। এবারো ব্যতিক্রম নয়। ইতোমধ্যে তার আমন্ত্রণে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা ডা. বিধান চন্দ্র রায় পোদ্দার সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তার গ্রামের বাড়ি সফর করেছেন। এটি ছিল তার স্থানীয় প্রশাসেন প্রভাব বিস্তারের অস্ত্র। যাতে অন্তর্বর্তী সরকারের নানা সুবিধা ভাগিয়ে নেয়া যায়। এতে সফল হতে চলছেন তিনি। এ নিয়ে সিলেট তথা সুনামগঞ্জে চলছে নানা আলোচনা সমালোচনা। জামিল চৌধুরীর বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার তাড়ল গ্রামে। তিনি নগরীর বাসিন্দা।
জানা যায়, ২০১৪ সালে সুনামগঞ্জ-২ আসনে জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী ছিলেন জামিল চৌধুরী। মূলত তিনি ছিলেন ডামি প্রার্থী। এই মনোনায়ন নেয়ার লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে বিজয়ী করা। পরে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে বিনা ভোটে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে বিজয়ী করার সুযোগ করে দেন।
সর্বশেষ বাতিল হওয়া সংসদেও তিনি ছিলেন সুরঞ্জিত সেনের স্ত্রী জয়া সেনগুপ্তার একনিষ্ঠ লোক। জামিল চৌধুরী নামে বেনামে গড়ে তুলেছে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ। কৌশলে হাতিয়ে নিয়েছে কনজুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর সভাপতি পদ। টানা ১৬ বছর স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা নিয়ে এখন আবার নতুন করে দালালীতে নেমেছে তিনি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ৫ আগস্টের বিপ্লবের আগে ২ জুলাই আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কোচেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী পরিষদ সচিব কবির বিন আনোয়ার জামিল চৌধুরীর আমন্ত্রণে দিরাইয়ে ফিমের একাডেমিতে আসেন। একইভাবে তার আমন্ত্রণে দিরাই এসেছিল রাতের ভোটের জনক তৎকালীন নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন। মূলত এদের দিয়ে বড় বড় তদবির বাণিজ্য করে তিনি গড়ে তুলেছেন বিশাল সাম্রাজ্য।
গত ১৬ বছর তার এনজিও গ্রামীণ জনকল্যাণ সংসদের কোনো কার্যক্রম ছিল না। গত ৫ আগস্টের পর থেকেই হঠাৎ করে এই এনজিওর নামে শুরু করে হাওর বিষয়ক নানা কর্মসূচি। আর এতে তাকে সহযোগিতা করছেন হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক অতিরিক্ত সচিব মো. আক্তারুজ্জামান। নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে করা এসব কর্মসূচির নামে বিপুল পরিমাণের অর্থ আত্মসাত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, জামিল চৌধুরীর বড় ছেলে এনাম চৌধুরী দিরাইয়ের ফিমেইল একাডেমির দেখভাল করেন। অভিযোগ রয়েছে ছেলে এনাম চৌধুরী জালিয়াতির মাধ্যমে দিরাইয়ে নির্মাণ করছেন জালাল সিটি নামের বহুতল শপিং মল। এর নির্মাণ কাজের অর্থের উৎস নিয়ে লোকমুখে নানান আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। জামিল চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের নারী সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। তিনি নিজে এবং তার বড় ছেলে এনাম চৌধুরীও নারী ক্যালেংকারিতে জড়িয়ে আলোচনায় এসেছেন।
তার ছোট ছেলে কায়েস চৌধুরী স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. মোমেনের এপিএস ছিলেন। এই সুবাদে বহু অপকর্ম করে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছে কায়েস। বিদেশে অর্থ পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিদেশে বসেও দেশে নিয়মিত তদবিরবাজী করেছে। তাকে নিয়ে অতীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। কায়েস ক্ষমতার অপব্যবহার করে চাচা নাজিম উদ্দীনকে বাদী বানিয়ে আপন ফুফাতো ভাই দিরাই উপজেলা বিএনপির প্রবীণ নেতা শফিকুর রহমান চৌধুরীকে মিথ্যা মামলায় ছয় মাস কারাবন্দী রাখেন। ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত জামিল চৌধুরী ও তার পরিবার শেখ হাসিনার পক্ষে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল।
সিলেট ও সুনামগঞ্জে অভিযোগ রয়েছে জামিল চৌধুরীর ভয়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার তটস্থ থাকতেন। তিনিও এখন খোলস পাল্টানোর নেশায় মত্ব। কনজুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ক্যাবের সভাপতি পদটি যেন তার সিড়ি। বিগত বন্যায় ক্যাব এর নাম ভাঙিয়ে ও বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা এনে নামমাত্র বিতরণ করে বাকী টাকা আত্মসাত করেন তিনি।
জানা গেছে, তার ব্যাংক এ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন দেখে কর গোয়েন্দা টিম জিজ্ঞাসাবাদ করলে তার দাপটে একসময় চুপসে যান।
এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে স্বৈরাচারী হাসিনার দোসর হয়েও বিপ্লবের সরকারের সকল সুযোগ সুবিধা নিতে দেখা যায় জামিল চৌধুরীকে। কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন দূরে থাক উপদেষ্টা কেবল স্বৈরাচারের দোসর জামিল চৌধুরীর ফিমেইল একাডেমি ও তার গ্রামের বাড়ি যান। অথচ এই ফিমেইল একাডেমির নামে সরকারের দেয়া অনুদান ও লন্ডন আমেরিকা থেকে শত কোটি টাকা এনে আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দুদক অতীতে অর্থআত্মসাতের বিষয়ে তদন্ত করেছে।
জানা গেছে, ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজও একাডেমির কোনো অডিট/নিরীক্ষা হয়নি। ১৯৯৪ সালে সিলেট নগরীর মেন্দিবাগে ২০ শতক জমি লিজ নিয়ে তৈরি করেন বহুতল ভবন। গ্রামীণ জনকল্যাণ সংসদ নামের এনজিওর নামে লিজ নিলেও দুই দশক ধরে এর কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ। সিলেট সুনামগঞ্জের লোকজন তার বিরুদ্ধে সুষ্ঠ তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এব্যাপারে জামিল চৌধুরী জানান, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন সাহেবর সাথে ভালো সর্ম্পক ছিল। এছাড়া তার উপর আরোপিত অভিযোগগুলো এড়িয়ে যান।
সিলেট জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ গণমাধ্যমকে জানান, জামিল চৌধুরী কনজুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ক্যাবের সভাপতি হিসেবে আমাদের কাছে আসেন। আমরা তার ব্যাপারে অতটা জানতাম না বলেই তার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। আগামীতে সচেতন থাকবো।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি









