শহীদুল ইসলাম : একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষার্থীদের ওপর। আর সেই শিক্ষার্থীদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো জাতীয় পাবলিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষাগুলো শুধু নম্বরের হিসাব নয়; এগুলো হাজারো স্বপ্ন, অসংখ্য পরিবারের ত্যাগ, বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা প্রস্তুতি এবং একটি উন্নত ভবিষ্যতের ভিত্তি। তাই জাতীয় পরীক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পাশাপাশি মানবিকতা, বাস্তবতা এবং দূরদর্শিতারও সমান গুরুত্ব থাকা উচিত।
সম্প্রতি বন্যা ও জলাবদ্ধতার মধ্যেই এইচএসসি পরীক্ষা-২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা সত্যিই বেদনাদায়ক। কোথাও শিক্ষার্থীরা কোমরসমান পানি পেরিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছেছে, কোথাও যানবাহনের অভাবে দীর্ঘ পথ হেঁটে যেতে হয়েছে, কোথাও ভেজা প্রবেশপত্র ও বই নিয়ে পরীক্ষার হলে বসতে হয়েছে। আবার কেউ সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে না পেরে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগই হারিয়েছে। এমন পরিস্থিতি কোনো সভ্য ও শিক্ষাবান্ধব রাষ্ট্রের জন্য স্বস্তিদায়ক হতে পারে না।
যারা পরীক্ষা দিয়েছে, তারাও কি সত্যিকার অর্থে সমান সুযোগ নিয়ে পরীক্ষা দিতে পেরেছে? একজন শিক্ষার্থী যদি আগের রাতটি বন্যার পানি থেকে ঘর রক্ষা করতে কাটায়, বই-খাতা ভিজে যায়, বিদ্যুৎ না থাকে, পরিবার খাদ্যসংকটে থাকে, তাহলে পরদিন তার কাছ থেকে স্বাভাবিক মানের পরীক্ষা প্রত্যাশা কতটা বাস্তবসম্মত? অন্যদিকে যে শিক্ষার্থী নিরাপদ পরিবেশে নিরবচ্ছিন্ন প্রস্তুতি নিতে পেরেছে, তার সঙ্গে একই মানদণ্ডে মূল্যায়ন কি প্রকৃত অর্থে ন্যায়সংগত?
বিশেষ করে বিজ্ঞানের মতো বিষয় উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি পরীক্ষার ফলই অনেক সময় একজন শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল শিক্ষা কিংবা কাঙ্ক্ষিত পেশাগত জীবনের দরজা খুলে দেয় বা বন্ধ করে দেয়। তাই দুর্যোগের মধ্যে নেওয়া একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রভাব বহু বছর ধরে একজন শিক্ষার্থীর জীবনে বহন করতে হতে পারে। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে, আমরা কি প্রতি বছর একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছি না?
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা নতুন নয়। প্রতিবছর জুন ও জুলাই মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বিশেষ করে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, চট্টগ্রামসহ বহু জেলা প্রায় প্রতিবছরই এই দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। এবছর তো আরো যোগ দিয়েছে বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা শহর, যেখানে জলাবদ্ধতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে শিক্ষার্থীরদের নাকাল অবস্থা ছিল। শিক্ষাকেন্দ্রিক সর্বোচ্চ কর্মকর্তাদের বারান্দায় ছিল দুর্যোগের প্রতিচ্ছবি। সবাই আশা করেছিল কয়েকটা পরীক্ষা মিনিমাম পেঁচানো হবে। অনেক শিক্ষার্থী অভিভাবক এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরাও অনুরোধ করেছিল পরীক্ষা পেছানোর জন্য কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী পাত্তাই দিল না। এতে করে অনেক নাগরিকরা তাদের মেজাজও হারিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রীর উপর।
তবে এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং আমাদের পরিচিত একটি মৌসুমি বাস্তবতা। তাহলে কেন এখনও এমন সময়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে, যখন লাখো শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক অংশগ্রহণই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে? এখন সময় এসেছে জাতীয় শিক্ষাপঞ্জি এবং পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি নতুন করে পর্যালোচনা করার। শুধু একটি বছরের অভিজ্ঞতা নয়, গত এক দশকের আবহাওয়া, বন্যার প্রবণতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণ করে একটি দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক ও দুর্যোগ-সংবেদনশীল একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করা জরুরি। এমন একটি ক্যালেন্ডার, যেখানে পরীক্ষার সময় নির্ধারণে আবহাওয়ার ঝুঁকি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
শুধু সময়সূচি পরিবর্তনই নয়, দুর্যোগকালীন বিকল্প ব্যবস্থাও এখন সময়ের দাবি। প্রয়োজনে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের জন্য পৃথক পরীক্ষার তারিখ, বিশেষ পরীক্ষা, বিকল্প মূল্যায়ন কিংবা অন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে নীতিগত আলোচনা শুরু করা উচিত। কারণ একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা তখনই পরিপক্ব হয়, যখন তা সংকটের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সমালোচনা কোনো শত্রুতা নয়; বরং নীতিগত উন্নয়নের অন্যতম অনুঘটক। তাই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের যে উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ভবিষ্যতে যেন কোনো শিক্ষার্থী শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় বৈষম্যের শিকার না হয়, সে লক্ষ্যে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, জাতীয় পরীক্ষার সাফল্য কেবল নির্ধারিত দিনে পরীক্ষা সম্পন্ন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন প্রত্যেক শিক্ষার্থী সমান সুযোগ, নিরাপদ পরিবেশ এবং মানসিক স্বস্তি নিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে।
আজ যারা বৃষ্টিভেজা শরীর, কাদামাখা পথ আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পরীক্ষার হলে পৌঁছেছে, তারা কেবল একটি পরীক্ষা দেয়নি; তারা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই লড়াইকে আরও কঠিন করে তোলা নয়, বরং সহজ করা। আমরা আশা করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, আবহাওয়াবিদ, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি জাতীয় পর্যায়ের পর্যালোচনা শুরু হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে পুরোনো ক্যালেন্ডার দিয়ে নতুন বাস্তবতার মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
আজকের প্রশ্ন একটাই, আমরা কি আগামী বছরও একই দৃশ্য দেখতে চাই? নাকি এখনই এমন একটি শিক্ষা নীতি গড়ে তুলতে চাই, যেখানে পরীক্ষার সময়সূচি শুধু ক্যালেন্ডার দেখে নয়, দেশের প্রকৃতি, জলবায়ু এবং শিক্ষার্থীদের জীবন-বাস্তবতাকে সামনে রেখেই নির্ধারণ করা হবে?
একটি মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয় তার ভবন, সড়ক কিংবা অবকাঠামো দিয়ে নয়; বরং সংকটের সময় সে তার সন্তানদের কতটা সুরক্ষা দিতে পারে, তা দিয়েই নির্ধারিত হয়। আমাদের বিশ্বাস, এখনই সময় পরীক্ষার দিন-তারিখ নয়, পরীক্ষার্থীর জীবন ও স্বপ্নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার।
শহীদুল ইসলাম
লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও কলামিস্ট।









