সামান্য বেতনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন তিনি। প্রথম নির্বাচন করার সময় বিভিন্নজনের কাছ থেকে স্বাক্ষর দেওয়া চেক দিয়ে নির্বাচনী খরচের টাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য হয়ে যেন টাকার মেশিন পেয়ে যান তিনি। গড়েছেন হাজার কোটি টাকার সম্পদের পাহাড়।
এমপি পদটিকে আলাদিনের চেরাগের মতো ব্যবহার করেছেন তিনি ও তাঁর পরিবারের লোকজন। সুনামগঞ্জ-১ আসন থেকে টানা তিনবার সংসদ সদস্য হয়ে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্ম দেন মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাবেক এই এমপির নানা অনিয়মের কাহিনি মুখে মুখে ঘুরছে তাঁর নির্বাচনী এলাকায়।
মাছ, ধান ও পাথরের জন্য প্রসিদ্ধ ধর্মপাশা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ ও মধ্যনগর উপজেলা নিয়ে সুনামগঞ্জ-১ আসন গঠিত। আউল-বাউল, কবি-সাহিত্যিক ও গুণীদের জন্য সুখ্যাতি রয়েছে এ জেলার। বিতর্কিত এ রাজনীতিবিদের জন্য সে ‘সুনামে’ টান পড়েছে। আওয়ামী লীগের সাবেক এই এমপির অবৈধ সম্পদের খোঁজে এবার মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল বুধবার তাহিরপুরে গিয়ে রতনের চাঁদাবাজি, দখলবাজির বিষয়ে খোঁজ নিয়েছেন দুদক কর্মকর্তারা। এর আগের দিন মঙ্গলবার সুনামগঞ্জ পৌর শহরে থাকা তাঁর বাড়িতে গিয়ে সেটির পরিমাপ করে দলটি। ৬ জানুয়ারি তাঁর গ্রামের বাড়ি ধর্মপাশা উপজেলার নওধার গ্রামেও গিয়েছিলেন তারা।
দুদকের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক। সিলেট বিভাগের দুর্নীতিবাজ এমপিদের মধ্যে রতনের নামও রয়েছে। দলের দায়িত্বশীলরাই বিভিন্ন সময় বলেছেন, দুই কোটি টাকা খরচ করে এ আসনে দলীয় মনোনয়ন এনেছিলেন তিনি। ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়ম-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও লুটপাটের মাধ্যমে নামে-বেনামে সম্পদ বানিয়েছেন। সরকারি ভূমি, নিরীহ লোকজনের জমি দখল করে নিজের নামে প্রতিষ্ঠান ও আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে নিজের ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য ৪৭টি কার্যালয় নির্মাণ করেছিলেন সাবেক এই সংসদ সদস্য। ৫ আগস্টের পর এসব অফিসে তালা দিয়েছেন স্থানীয়রা। এ ছাড়া সরকারি জমিতে করা কয়েকটি অফিস নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
রতনের সেই দখল হওয়া জমি ফেরত পেতে সক্রিয় হয়েছেন বিক্ষুব্ধরা। তাঁর নওধার গ্রামের আলিশান বাড়ির চার দেয়ালের ভেতর দখলে নেওয়া ৩০ শতক জমি এবং ইটভাটার জন্য নেওয়া দুই একর পাঁচ শতক জমি ফেরত না পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন জমির মালিক বিকাশ রঞ্জন সরকার। তিনি জানান, পাইকুরাটি মৌজায় ধানিকোনা গ্রামসংলগ্ন এলাকায় ইটভাটা করার কথা বলে দুই একর পাঁচ শতক জমি তাঁর ভাই মোবারক হোসেন ও মোজাম্মেল হোসেন রুকনের নামে লিখিয়ে নেন রতন। জমির টাকার তাগাদা দেওয়ায় তাঁর সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে থাকেন। ব্যাংকের কর্মকর্তা হওয়ায় তাঁকে ২০১২ থেকে ২০২০ পর্যন্ত তিন উপজেলায় বদলি করান।
দীর্ঘদিন নিজের বাড়িতে যাওয়ার সাহস পাননি জানিয়ে বিকাশ বলেন, ‘একবার পাইকুরাটিতে পৈতৃক জমি অন্যের কাছে বিক্রির পর বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য গেলে এমপি ও তাঁর ভাই মোশারফ হোসেন ওরফে হাজি মাসুদ আমাকে মারধর করে আটকে রাখেন। শেষে জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন দিলে পুলিশ গিয়ে আমাকে উদ্ধার করে। পরে আমার নামে দুটি মামলা করা হয়। উভয় মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আমি ছাড়া গ্রামের অন্যদের বাড়িও দখল করেন রতন।’
ধর্মপাশা উপজেলার সেলবরস ইউনিয়নের মাটিকাটা গ্রামের বাসিন্দা মতিউর রহমান বলেন, ‘নিজের নামে করা স্কুলের খেলার মাঠের জন্য আমাদের জমি দখলে নেওয়া হয়। আমাদের পুকুরপাড় ও বাড়ির গাছ কেটে নিয়েছে তাঁর লোকজন। বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে। মামলার ভয়ে বাড়ি ছাড়তে হয়েছে। এমপি ও তাঁর লোকদের ভয়ে গ্রামের মানুষ এমন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেও পারেনি।’
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে নৌকা প্রতীকে এমপি নির্বাচিত হন মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। এরপর ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়ম-দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি শুরু করেন। বালু-পাথর উত্তোলন, কয়লা আমদানিকারক সমিতি, বিভিন্ন মার্কেট, বাজার, নানাজনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি করতেন তিনি। তাঁর নামে ঢাকা, সুনামগঞ্জ, ধর্মপাশা, নেত্রকোনা ও মোহনগঞ্জে একাধিক বাড়ি রয়েছে। গুলশান-১-এ রয়েছে দামি ফ্ল্যাট।
ধর্মপাশায় নিজের গ্রামে ১০ কোটি টাকা খরচ করে তৈরি করেছিলেন বিলাসবহুল বাড়ি ‘হাওর বাংলা’। সুনামগঞ্জ শহরের মল্লিকপুরে জেলা পুলিশ লাইন্সের বিপরীতে কোটি টাকায় বাড়ি ‘পায়েল পিউ’ কিনেছেন তিনি। প্রবাসেও বিশেষ করে কানাডায় সম্পদের পাহাড় গড়েছেন– এমন আলোচনাও আছে এলাকায়। অথচ নির্বাচনী হলফনামায় অনেক কমমূল্য দেখিয়েছেন এসব বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্টের।
বর্তমানে তাঁর গ্রামের বিলাসবহুল বাড়ি ভাড়া দিয়েছেন বিদেশি কোম্পানি নরিনকো ইন্টারন্যাশনালের (এইচকেজিই সোলার পাওয়ার প্লান্ট) কাছে। রতনের ব্যবসায়িক যোগাযোগ রক্ষা করেন ফজলুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। আওয়ামী লীগের লোকজন জানান, রতন এখন পলাতক।
অভিযোগ রয়েছে, কেবল বিলাসবহুল বাড়ি নয়, সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানা জমি দখল করে নিজের নামে করেছেন মোয়াজ্জেম হোসেন রতন টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ। জমির প্রকৃত মালিককে উচ্ছেদ করতে সংগঠনের লোক ও আত্মীয়স্বজন নিয়ে বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানোর অভিযোগও আছে তাঁর বিরুদ্ধে।
নির্বাচনী হলফনামায়ও মিথ্যা তথ্য
বারবারই সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন সাবেক এমপি রতন। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমা দেওয়া হলফনামায় দেখানো আয় থেকে পরের তিনটি হলফনামায় অনেক কম আয় দেখিয়েছেন। তবে নবম সংসদ নির্বাচনের হলফনামা থেকে পরের তিনটি হলফনামায় ক্রমান্বয়ে বেড়েছে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ। এর মধ্যে স্থাবর সম্পদ বেড়েছে দ্বিগুণ ও অস্থাবর সম্পদ বেড়েছে তিন গুণের বেশি। তাঁর নিজের দেখানো আয় ও স্থাবর সম্পদ বেড়ে যাওয়ার তথ্যেও আছে গরমিল।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, রতন সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গা দখল করে বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে নিজের জন্য ৪৭টি অফিস নির্মাণ করেছেন। তাহিরপুরের তিন শুল্ক স্টেশন ও বালু-পাথরমহাল যাদুকাটায় চাঁদাবাজি করেছেন।
সাবেক এই সংসদ সদস্যের সঙ্গে ঢাকার যুবলীগ নেতা বিতর্কিত ঠিকাদার জি কে শামীমের সম্পর্ক নিয়ে বছর দুয়েক আগে গণমাধ্যমে একাধিক সংবাদ ছাপা হয়। অবৈধ জুয়া ও ক্যাসিনো কারবার, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় রতনকে। এক পর্যায়ে তাঁর বিদেশযাত্রাও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
দুদকের অনুসন্ধান দলের সদস্য সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান ভুঁইয়া জানান, মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের বিরুদ্ধে আগেও অভিযোগ ছিল। ৫ আগস্টের পর আরও কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের পরিচালক আবদুল মাজেদের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি দল তাঁর অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করছে। অনুসন্ধান শেষে তারা দুদকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দেবেন।
সাবেক এই এমপির বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে পুলিশ সুপার আ ফ ম আনোয়ার হোসেন খান বলেন, আট-দশ দিন আগে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় দেখা গেছে, সাবেক এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন দেশে নেই দেখা গেছে। যদি দেশে থাকেন, অবশ্যই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করবে।
আবার যখন আওয়ামী লীগ আসবে, সব দৌড়াইয়া পালাবে : রতন
সাবেক সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করলে তিনি এসব অভিযোগের উত্তর এড়িয়ে বলেন, এখন কতজনে কত কথা বলবে। দেশেই আছি, আমরা মাঠে নামলে সবাই দৌড়ে পালাবে।
তিনি আরও বলেন, ‘যখন আপনি ভালো থাকবেন, তখন মন্দ কাজ করলেও লোকে ভালো বলবে। যখন খারাপ থাকবেন, তখন ভালো কাজটাও সবাই মন্দ বলবে। অফিস করেছি, দলের জন্য কাজ করেছি এটি দোষের কিছু নয়। ডিসি খতিয়ানের অনেক জায়গা লিজ নিয়ে অফিস করা হয়েছে, এটিও দোষের কিছু নয়। এখন অফিস অন্যরা দখলে নিয়েছে, আবার যখন মাঠে আওয়ামী লীগ আসবে, সব দৌড়াইয়া পালাবে– এটিই বাস্তবতা। বিএনপি নেতারা আমার বিরুদ্ধে বলবেই, কিছু করার নেই। আমাদের দলের লোকও কিছু আছে, যারা এসব সমালোচনা করছে।’
আজকের সিলেট/ডি/এসটি









