শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২০ অপরাহ্ন

আট মাসে ২০ বার বিকল ট্রেনের ইঞ্জিন

'আতঙ্কের নাম' লাউয়াছড়ার পাঁচ কিলোমিটার রেলপথ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৬/১১/২০২৬ ০৯:২৮:০৯ পূর্বাহ্ন

'আতঙ্কের নাম' লাউয়াছড়ার পাঁচ কিলোমিটার রেলপথ


পাহাড়ের বুক চিরে সবুজ অরণ্যের ভেতর দিয়ে চলে গেছে রেললাইন। দুই পাশে লাউয়াছড়ার ঘন বন, আর মাঝখানে আঁকাবাঁকা মাত্র পাঁচ কিলোমিটারের এক ঝুঁকিপূর্ণ পথ। এই পথ পাড়ি দিতে গিয়েই বারবার থমকে যাচ্ছে ট্রেন। কখনো ইঞ্জিন বিকল, কখনো বগি বিচ্ছিন্ন, আবার কখনো লাইনচ্যুতির ঘটনা। মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়া আখাউড়া-সিলেট রেলপথ এখন যাত্রীদের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই অন্তত ২০ বার ইঞ্জিন বিকল হয়ে নির্জন বনের মধ্যে আটকে পড়েছে একাধিক যাত্রীবাহী ট্রেন। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি নিয়মিত ঘটছে ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়।

সর্বশেষ গত ১ অক্টোবর রাতে আন্তনগর কালনী এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল হয়ে এক ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। এর পরদিন ২ অক্টোবর দুপুরে চট্টগ্রামগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের হুক ছিঁড়ে নয়টি বগি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে তিন ঘণ্টা বন্ধ থাকে ট্রেন যোগাযোগ।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ১৮৯৮ সালে তৎকালীন আসাম-চট্টগ্রাম যোগাযোগের জন্য নির্মিত হয়েছিল এই রেলপথ। শতবছরেরও বেশি পুরোনো এ লাইনে বর্তমানে ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে প্রতিদিন ছয়টি আন্তনগর ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনে প্রতিদিন যাতায়াত করেন প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী।

সরেজমিনে শ্রীমঙ্গল ও ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশনের মধ্যবর্তী লাউয়াছড়া বনের ভেতরের রেলপথ ঘুরে দেখা গেছে, স্লিপারের নাট-বল্টু ও ক্লিপের বেশিরভাগই নেই। কোথাও ঢিলে হয়ে যাওয়া ক্লিপে নামমাত্র ঝালাই দেওয়া হয়েছে, আবার কোনো কোনো স্থানে নাট তার দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা হয়েছে। রেলপথের এমন বেহাল দশায় ঝুঁকি নিয়ে ট্রেন চলাচল করছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, লাউয়াছড়া বনের ভাঙা ব্রিজ এলাকায় রেললাইনের ঢাল অনেক বেশি। পাহাড়ি এই উঁচু পথ দিয়ে ট্রেন টেনে তুলতে শক্তিশালী ইঞ্জিন প্রয়োজন। কিন্তু সিলেট রুটে সরবরাহ করা হচ্ছে ১৮-১৯ বছরের পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ ২৯০০ ও ২৬১০ সিরিজের ইঞ্জিন।

শ্রীমঙ্গল ও ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা থেকে যে ইঞ্জিন নিয়ে ট্রেন সিলেটে আসে, পর্যাপ্ত বিকল্প না থাকায় একই পুরোনো ইঞ্জিন দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ফিরতি ট্রেন চালাতে হয়। পাহাড়ি ঢাল কিংবা উঁচু পথে ওঠার সময় এসব ইঞ্জিনের প্রেসার কমে যায়। ফলে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ট্রেন মাঝপথে থেমে পড়ছে। কোনো কোনো ট্রেনে বগির সংখ্যা বাড়ানো হলেও ইঞ্জিনের সক্ষমতা না বাড়ায় যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা কমছে না।

চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে লাউয়াছড়া বনের ভেতরে একের পর এক ট্রেন আটকে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল হয়ে পাঁচ ঘণ্টা আটকে থাকে। ১ মার্চ রাতে উপবন এক্সপ্রেসও পাঁচ ঘণ্টা আটকে ছিল। ৭ মার্চ ও ১৯ মার্চ কালনী এক্সপ্রেস যথাক্রমে দেড় ও দুই ঘণ্টা বিলম্ব করে। ১ এপ্রিল কালনী এক্সপ্রেস আটকে থাকে পাঁচ ঘণ্টা। ২৯ মে তেলবাহী ট্রেনের একটি বগি লাইনচ্যুত হয়। সর্বশেষ ১ ও ২ অক্টোবর কালনী ও পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল এবং বগি বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনায় ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে।

এদিকে রেলপথের আধুনিকায়নেও দেখা যাচ্ছে দীর্ঘসূত্রতা। জানা গেছে, ২০১৯ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) সভায় আখাউড়া-সিলেট মিটারগেজ রেলপথ ডুয়েল গেজে রূপান্তরের জন্য ১৬ হাজার ১০৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মাঠপর্যায়ে কাজের কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি।

এ পরিস্থিতিতে সিলেট বিভাগের জীর্ণ রেলপথ সংস্কার ও নতুন ট্রেনের দাবিতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় লাগাতার কর্মসূচি পালন করছে ‘আট দফা দাবি বাস্তবায়ন আন্দোলন পরিষদ’।

পরিষদের মুখ্য সমন্বয়ক আজিজুল ইসলাম বলেন, সিলেট বিভাগের রেলপথ দীর্ঘদিন ধরে চরম অবহেলার শিকার। রেলপথের বেহাল অবস্থা দূর করার দাবিতে তাঁরা মানববন্ধন ও ট্রেন অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করেছেন। এ সমস্যা সমাধানে সরকারের দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা (বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ) কাজী নাজমুল হক বলেন, লাউয়াছড়া বনের ভেতরে মাগুরছড়া এলাকায় প্রায়ই ট্রেন আটকে পড়ার খবর পান তাঁরা। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বন বিভাগের কর্মীরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা করেন।

ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার গৌড় প্রসাদ দাস পলাশ বলেন, লাউয়াছড়ার ভাঙা ব্রিজ এলাকার পাহাড়ি চড়াইয়ে উঠতে গিয়ে প্রায়ই আন্তনগর ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়। গত আট মাসে অন্তত ২০ বার এমন ঘটনা ঘটেছে।

শ্রীমঙ্গল রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সাইফুল্লাহ বলেন, লাউয়াছড়ার পথটি পাহাড়ি হওয়ায় ট্রেনের গতি কমিয়ে সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে হয়। রেলওয়ের প্রকৌশল দল নিয়মিত রেললাইন পর্যবেক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দীন বলেন, নতুন ইঞ্জিনের সংকটের কারণে মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়েই ট্রেন চালাতে হচ্ছে। এসব ইঞ্জিন কাঙ্ক্ষিত গতি তুলতে পারছে না। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রুত নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর