রাজনগরে সংযোগ সড়কের অভাবে চার বছরেও চালু হয়নি সেতু, দুর্ভোগে ১২ গ্রামের ১৫ হাজার মানুষ
নদীর বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে কোটি টাকার স্বপ্ন। কংক্রিটের স্তম্ভ আর পাটাতনে নির্মিত হয়েছে পারাপারের পথ, অথচ সেই পথের দুই প্রান্তে নেই সংযোগ। তাই সেতু আছে, নেই চলাচল; উন্নয়নের অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু মানুষের দুর্ভোগের অবসান হয়নি। নদী পার হতে আজও ভরসা ডিঙি নৌকা আর নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো।
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের দক্ষিণ ইসলামপুরসহ অন্তত ১২টি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা এটি। লাঘাটা নদীর ওপর চার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি যেন দাঁড়িয়ে আছে এক অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির প্রতীক হয়ে। ২০২০ সালে শুরু হওয়া নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময় পেরিয়ে বহু দূর এগোলেও সেতুর দুই প্রান্তে সংযোগ সড়ক না থাকায় এখনো পূরণ হয়নি মানুষের স্বস্তিতে নদী পার হওয়ার স্বপ্ন।
উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রাজনগর উপজেলার কামারচাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-ধলাই খেয়াঘাট সড়কের আওতায় লাঘাটা নদীর ওপর ৬০ মিটার দীর্ঘ আরসিসি সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২০ সালের ৬ জুলাই। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৪ কোটি ৪ লাখ ৩ হাজার ৪৪৯ টাকা।
চুক্তি অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘প্রিন্স মামুন (জেভি)’-এর ২০২১ সালের ১৮ নভেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে প্রায় চার বছর অতিবাহিত হলেও সেতুটি পুরোপুরি চলাচলের উপযোগী হয়নি।
নদীর দুই তীরে সংযোগ সড়ক না থাকায় সেতুটি যেন পথহীন এক পথের নাম। ওপারে যাওয়ার স্বপ্ন সামনে থাকলেও সেই স্বপ্নে পা রাখার রাস্তা এখনো তৈরি হয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মূল সেতুর কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকলেও দুই প্রান্তে সংযোগ সড়ক না থাকায় সেটি কার্যত বিচ্ছিন্ন। দক্ষিণ ইসলামপুর, খাস প্রেমনগর, মিটিপুর, ভোলানগর, শ্যামেরকোনা, নওয়াগাঁও, আলালপুর, হাটিকরাইয়া, গোবিন্দপুর ও কালইকুনাসহ অন্তত ১২টি গ্রামের মানুষের যাতায়াত এখনো দুর্ভোগের নামান্তর।
নদীর এপার-ওপার হতে প্রতিদিনই মানুষকে পাড়ি দিতে হয় অনিশ্চয়তার পথ। বর্ষায় ডিঙি নৌকা, আর নদীর ওপর নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো এ যেন তাঁদের প্রতিদিনের যাত্রাসঙ্গী। যেখানে একটি সেতু হওয়ার কথা ছিল নিরাপদ যোগাযোগের প্রতীক, সেখানে নদী পারাপার এখনো অনেকের কাছে ঝুঁকি আর ভোগান্তির অভিজ্ঞতা।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, প্রবীণ ব্যক্তি ও মুমূর্ষু রোগীরা। জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে পৌঁছানোও তাঁদের জন্য হয়ে ওঠে কঠিন এক পরীক্ষা। অন্যদিকে কৃষকের উৎপাদিত ফসল বাজারে নেওয়া এবং ব্যবসার মালামাল পরিবহনে বাড়ছে সময় ও খরচ। যোগাযোগের সহজ পথ না থাকায় প্রতিদিনই যেন বাড়তি মূল্য দিতে হচ্ছে স্থানীয় মানুষকে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা ছিল, সেতুটি চালু হলে নদী পারাপারের কষ্ট কমবে, সহজ হবে শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও ব্যবসার যোগাযোগ। কিন্তু নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রতায় সেই প্রত্যাশা এখন হতাশায় রূপ নিয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মুজিব মিয়া বলেন, “সেতুটি চালুর আশায় ছিলাম, কিন্তু কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও আমাদের দুঃখ ঘুচলো না। বর্ষাকালে নৌকা আর সাঁকোই আমাদের একমাত্র ভরসা।”
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে সেতুটি চালু করা হোক। তাঁদের ভাষায়, নদীর ওপর সেতু দাঁড়ালেই উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না; সেই সেতু দিয়ে মানুষের চলাচল নিশ্চিত হলেই তার সুফল পৌঁছায় জনজীবনে।
উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষা মৌসুমে প্রয়োজনীয় মাটি সংগ্রহ করতে না পারায় সংযোগ সড়কের কাজ দীর্ঘদিন আটকে ছিল। এ ছাড়া জমি অধিগ্রহণের একটি পরিকল্পনা নেওয়া হলেও আইনি জটিলতার কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ অবস্থায় জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে বিদ্যমান পরিস্থিতিতেই সংযোগ সড়ক বা অ্যাপ্রোচ রোডের কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাজনগর উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) আব্দুল গনি বলেন, “মূল সেতুর কাজ প্রায় শেষ হলেও বর্ষার কারণে মাটি না পাওয়ায় সংযোগ সড়কের কাজ বিলম্বিত হয়েছে। জমি অধিগ্রহণেও কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে। তাই বর্তমান অবস্থাতেই আমরা সংযোগ সড়ক বা অ্যাপ্রোচের কাজ সম্পন্ন করব।”
তিনি আরও জানান, ঠিকাদার পটুয়াখালী জেলার বাসিন্দা হওয়ায় দু-এক দিনের মধ্যে এলাকায় পৌঁছাবেন। চলতি সপ্তাহে সম্ভব না হলেও আগামী সপ্তাহের মধ্যেই সংযোগ সড়কের মাটির কাজ পুরোদমে শুরু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘প্রিন্স মামুন (জেভি)’-এর কাজের ধীরগতির বিষয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
লাঘাটা নদীর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা সেতুটি আজ শুধু কংক্রিটের কাঠামো নয়, এটি ১২ গ্রামের মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষারও প্রতিচ্ছবি। চার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত সেতুর দুই প্রান্তে সংযোগ সড়ক না থাকায় উন্নয়নের সুফল এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
নদী আছে, সেতু আছে শুধু নেই চলাচলের পূর্ণ পথ। স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, আশ্বাস যেন আর দীর্ঘ অপেক্ষায় হারিয়ে না যায়। দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে সেতুটি চালু হলে হয়তো একদিন ডিঙি নৌকা আর নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভরতার অবসান ঘটবে। লাঘাটার দুই তীর তখন সত্যিকার অর্থেই যুক্ত হবে মানুষের পথচলায়, আর স্বস্তি ফিরবে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগে ক্লান্ত জনপদে।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
রাজনগর (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি 








