নিষেধাজ্ঞার পরও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে থ্রি-হুইলার, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৮ PM

নিষেধাজ্ঞার পরও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে থ্রি-হুইলার, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০/০৯/২০২৬ ০৯:৫৮:৪৬ AM

নিষেধাজ্ঞার পরও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে থ্রি-হুইলার, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি


জাতীয় মহাসড়কে থ্রি-হুইলার ও অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে খুব একটা কাজে আসছে না সিলেট অংশে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন ধরনের থ্রি-হুইলার ও অযান্ত্রিক যান নিয়মিত চলাচল করছে। কোথাও কোথাও মহাসড়কের আইল্যান্ডেই সারি করে রাখা হচ্ছে সিএনজি অটোরিকশা।

পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই নিষিদ্ধ এসব যান মহাসড়কে চলছে। অন্যদিকে বিআরটিএ ও হাইওয়ে পুলিশ বলছে, নিষিদ্ধ যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের সিলেট অংশে দুর্ঘটনার ঘটনাও বেড়েছে। গত ১৫ দিনে এই অংশে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৯ জন নিহত হয়েছেন। গত সাত মাসে প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় ৫০।

গত ২২ আগস্ট দুপুরে ওসমানীনগর উপজেলার ব্রাহ্মণগ্রাম এলাকায় তেলবাহী ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের মা-বাবা ও মেয়েসহ চারজন নিহত হন। এর আগে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে মহাসড়কে বাস ও পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজনের মৃত্যু হয়। আর গত ৭ আগস্ট ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন ১০ জন।

সরকারি পরিসংখ্যানও সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত সিলেট বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৬৯ জন নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৪ জনের প্রাণ গেছে এসব দুর্ঘটনায়।

তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ২২টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত ও ২৯ জন আহত হন। ফেব্রুয়ারিতে ১৭টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৮ জন, আহত ৪৩ জন। মার্চে ২১টি দুর্ঘটনায় ২২ জন নিহত ও ৩১ জন আহত হন। এপ্রিলে ১৪টি দুর্ঘটনায় ২০ জন নিহত ও ২৪ জন আহত হন। মে মাসে ৩৩টি দুর্ঘটনায় ৩৮ জন নিহত ও ৫৩ জন আহত হন। জুনে ২১টি দুর্ঘটনায় ২০ জন নিহত ও ২৬ জন আহত হন। সবশেষ জুলাইয়ের প্রাপ্ত তথ্যে ১৭টি দুর্ঘটনায় ২০ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ।

মহাসড়কে সিএনজির দাপট

মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচলের কারণে ঝুঁকি বাড়ছে বলে অভিযোগ চালক ও পথচারীদের। যত্রতত্র থামা, যাত্রী ওঠানামা, সিগন্যাল না মানা এবং অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে ব্যস্ত সড়কে তৈরি হচ্ছে বাড়তি ঝুঁকি। কোথাও আবার মহাসড়কের পাশে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্ট্যান্ড।

চণ্ডীপুল পয়েন্টের আইল্যান্ডে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখার কারণ জানতে চাইলে সিএনজি চালকদের একজন বলেন, স্ট্যান্ডের মূল জায়গায় পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় সেখানে গাড়ি রাখা হয়েছে। একই কথা জানান অন্য কয়েকজন চালকও। তাদের ভাষ্য, জায়গা কম হলেও তারা ‘কেয়ারফুল’ থাকেন।

মহাসড়কে সিএনজি চলাচল নিষিদ্ধ থাকার বিষয়টি জানতে চাইলে এক চালক বলেন, যে জায়গায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেখানে তারা যান না। তবে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে তাদের দায় নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি তিনি।

যত্রতত্র ব্রেক করা, যাত্রী ওঠানামা এবং ট্রাফিক সিগন্যাল না মানার অভিযোগও অস্বীকার করেন সালমান নামের এক চালক। তার বক্তব্য, তাদের গাড়িতেও সিগন্যাল রয়েছে এবং তারা কেন সিগন্যাল মানবেন না।

আরেক চালক দুর্ঘটনা কমাতে গাড়ি রাখার জন্য নির্দিষ্ট পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার দাবি জানান। তার পরামর্শ, সরকার গাড়ি রাখার জায়গা করে দিলে সমস্যা কমবে এবং চালকদেরও চিন্তা-ভাবনা করে ওভারটেক করতে হবে।

দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে নানা মত

চালক ও পথচারীদের কেউ সড়কের নির্মাণকাজের ধীরগতি, কেউ অবৈধ স্ট্যান্ড ও পার্কিং, আবার কেউ যাত্রী ওঠানামা এবং বাস-ট্রাকের বেপরোয়া গতিকে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করছেন। তাদের মতে, একই মহাসড়কে বড় ও ছোট যানবাহন চলাচলের কারণে ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

এক পিকআপচালকের ভাষ্য, নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও অযান্ত্রিক যান মহাসড়কে চলার বিষয়টি প্রশাসনের দুর্বলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলে এসব যান চলাচল করতে পারত না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, সড়কের সংস্কারকাজ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি মহাসড়কে সিএনজি চলাচলও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বলে মনে করেন তিনি।

চণ্ডীপুলে দায়িত্ব পালনরত এক ট্রাফিক পুলিশের কাছে মহাসড়কে সিএনজির বেপরোয়া চলাচল এবং আইল্যান্ডে অবৈধ পার্কিং সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য না করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।

তবে আরেক ট্রাফিক পুলিশ সদস্য দাবি করেন, নিষিদ্ধ যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। তার ভাষ্য, প্রতিদিনই অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ অটোরিকশা, সিএনজি ও মোটরসাইকেল আটক করা হচ্ছে।

‘প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলছে’

মহাসড়কে নিষিদ্ধ যান চলাচলের পেছনে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবহন শ্রমিক নেতারা।

সিলেট জেলা বাস-মিনিবাস-কোচ-মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি হাজী মইনুল ইসলাম বলেন, মহাসড়কে নসিমন-করিমন-সিএনজি-ইজিবাইক-ব্যাটারি চালিত গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ হলেও সেগুলো চলছে। তার অভিযোগ, প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই এসব যান চলাচল করছে। কারণ মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকজন থাকার পরও এগুলো বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, ‘অবৈধ রোহিঙ্গা সিএনজিগুলোর’ বিরুদ্ধে সিএনজি শ্রমিক ইউনিয়ন ও তারাও অবস্থান করছেন। কিন্তু আইন অমান্য করে সেসব সিএনজি হাইওয়ে রোডে চলাচল করছে এবং পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে চলছে বলে দাবি করেন তিনি।

গ্যাস পাম্প ও বাই লেনের দাবি

সিএনজিচালিত শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের বক্তব্য, মহাসড়কের পাশে গ্যাস পাম্প থাকায় সিএনজিগুলোকে মহাসড়ক ব্যবহার করতে হয়। পাশাপাশি বাই লেন না থাকাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

সিলেট জেলা সিএনজি চালিত অটোরিকশা-অটো টেম্পু চালক শ্রমিক জোটের সভাপতি মো. মতছির আলী বলেন, নাম্বারযুক্ত সিএনজি চলাচলের জন্য আলাদা রাস্তা না থাকায় তাদের হাইওয়ে ব্যবহার করতে হয়। কারণ হাইওয়ে ছাড়া গ্যাস নেওয়ার মতো কোনো সিএনজি গ্যাস পাম্প নেই।

তার দাবি, বর্তমানে সিএনজি গণপরিবহনের পাশাপাশি রোগী পরিবহনেও ব্যবহৃত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্সের মতো সেবা দিচ্ছে। তাই হাইওয়েতে সিএনজির গ্যাস নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

মো. মতছির আলী আরও বলেন, তাদের মেট্রোপলিটন এলাকার সীমা নাজিরবাজার পর্যন্ত। রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ হওয়ায় দ্রুত সংস্কারের পাশাপাশি টমটম গাড়ি সরিয়ে নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

সংগঠনের নেতারা বলেন, থ্রি-হুইলার চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর থেকেই তারা মহাসড়কের পাশে পার্শ্ব সড়ক বা বাই লেন নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, বাই লেন থাকলে তারা মহাসড়ক ব্যবহার না করেই চলাচল করতে পারবেন। যাত্রী ও শ্রমিকদের স্বার্থে এই ব্যবস্থা জরুরি বলেও তারা দাবি করেন।

বিআরটিএ ও হাইওয়ে পুলিশের বক্তব্য

বিআরটিএর সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) প্রকৌশলী আবদুর রশিদ বলেন, ২০১৫ সালে জাতীয় মহাসড়কে অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরপর বিআরটিএ, পুলিশ ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে এসব যান চলাচল বন্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে। বিভিন্ন সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকবে।

দুর্ঘটনা কমাতে চালক ও যাত্রীদের সচেতন হওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, একটি সিএনজিতে ৩জন যাত্রী নেওয়ার নিয়ম থাকলেও অনেক সময় ৪/৫ জন নেওয়া হয়। চালকের পাশে যাত্রী বসারও নিয়ম নেই। সেখানে কেউ বসলে চালক নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

হাইওয়ে পুলিশের সদ্য বিদায়ী পুলিশ সুপার রেজাউল করিম বলেন, প্রতিটি থানার আওতাধীন সড়কের পরিমাণ ৪৭/৫০/৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত। এর বিপরীতে জনবল ও লজিস্টিক স্বল্পতা রয়েছে। তারপরও সীমিত জনবল ও লজিস্টিক দিয়ে সড়ক আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, থ্রি-হুইলারের সংখ্যা বেশি হওয়ায় আইন প্রয়োগে সময় লাগছে। তবে ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী নিয়মিত অভিযান ও জব্দ কার্যক্রম চলছে।

কঠোর নির্দেশনার পরও বদলায়নি চিত্র

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মহাসড়কে অননুমোদিত ও লাইসেন্সহীন থ্রি-হুইলার এবং নন-মোটরাইজড যান চলাচল বন্ধে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। প্রচলিত আইন অনুযায়ী এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

এরও আগে ২০১৫ সালের ১ আগস্ট থেকে জাতীয় মহাসড়কে থ্রি-হুইলার অটোরিকশাসহ সব শ্রেণির অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। দেশের ২২টি জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।

কিন্তু নিষেধাজ্ঞার প্রায় এক দশক পরও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। মহাসড়কের সিলেট অংশে সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ যানবাহনের চলাচল অব্যাহত রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই এই পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান হবে না। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে বিআরটিএ, হাইওয়ে পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়ে কার্যকর টাস্কফোর্স গঠন এবং নিয়মিত নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর