গর্ভকালে চিকিৎসাবঞ্চিত মা, শিশুর জীবনে স্থায়ী ক্ষত
মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ১২:৪০ AM

গর্ভকালে চিকিৎসাবঞ্চিত মা, শিশুর জীবনে স্থায়ী ক্ষত

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১/০৫/২০২৬ ০৯:৩৮:৫৩ AM

গর্ভকালে চিকিৎসাবঞ্চিত মা, শিশুর জীবনে স্থায়ী ক্ষত


সাত বছরের আতিক ইসলাম। নিষ্পাপ মুখে সবসময়ই লেগে থাকে একরাশ হাসি। সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার ঘোরজান ইউনিয়নের ফুলহারা গ্রামের সরু মাটির পথে অন্য শিশুদের দিকে তাকিয়ে সেও হাসে, হাত নেড়ে ডাকতে চায়। কিন্তু সেই হাসির আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক অসহায় পরিবারের দীর্ঘশ্বাস।

আতিকের বাবা আজিজ উদ্দিন বলেন, “ওর মা যখন ওরে পেটে নেয়, তখন বয়স ছিল ১৫-১৬ বছর। কিছুই বুঝত না। ডাক্তারও দেখানো হয় নাই। ঘরের সব কাজই করত।”

দরিদ্র চরাঞ্চলের সেই পরিবারে গর্ভকালীন বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার কিংবা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কোনোটাই ছিল না। নদী পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে যাওয়া ছিল কষ্টসাধ্য। তাই প্রসবের সময় গ্রামের এক দাইয়ের (ধাত্রী) ওপরই ভরসা করেছিলেন তারা।

আজিজ উদ্দিনের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে, “বাড়িতেই ডেলিভারি হইছিল। তখন তো বুঝি নাই সামনে কী হইবো। এখন মনে হয়, যদি একটু চিকিৎসা করাইতে পারতাম, যদি হাসপাতালে নিতে পারতাম…”

আতিক এখনো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না। কথা বলতেও কষ্ট হয় তার। বয়স বাড়লেও অন্য শিশুদের মতো স্কুলে যাওয়া, মাঠে দৌড়ানো কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করা তার হয়ে ওঠেনি। তবু প্রতিদিন উঠোনের কোণে বসে অন্য শিশুদের খেলা দেখে সে মুগ্ধ চোখে।

মা যখন ঘরের কাজ করেন, আতিক তখন চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে থাকে। কখনো মাটিতে বসে ভাঙা খেলনা নিয়ে খেলার চেষ্টা করে, কখনো আবার বাবার কোলে মাথা রেখে নিশ্চুপ হয়ে যায়।

ছেলেকে নিয়ে বাবার কণ্ঠে আক্ষেপ ঝরে, “গরিব মানুষ, ঠিকমতো চিকিৎসা করাইতে পারি নাই। এখন শুধু চাই, আল্লাহ যেন ওরে একটু ভালো করে দেয়।”

ফুলহারা গ্রামের মানুষের কাছে আতিক অনেক আদরের। তবে, স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত এ অঞ্চলের এক নীরব প্রতিচ্ছবি এ প্রতিবন্ধিতা। যেখানে অল্প বয়সে মাতৃত্ব, চিকিৎসার অভাব আর দারিদ্র্যের বোঝা মিলেমিশে জন্ম দিচ্ছে ঝুঁকিতে থাকা এক প্রজন্ম।

ঘোরজানে ৪০০ প্রতিবন্ধী
শুধু আতিক নয়, ঘোরজানের অনেক ঘরেই এমন বিশেষ শিশু রয়েছে। ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আলিনুর আলী বলেন, ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে প্রায় ৪০০ জন প্রতিবন্ধী রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ২৫০ জনই শিশু।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বাস্থ্যকর্মীরা মনে করেন, মাতৃস্বাস্থ্যসেবার সংকট ও চিকিৎসা অবহেলার কারণে প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা বাড়ছে ঘোরজানে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবার অভাব, অল্প বয়সে মাতৃত্ব এবং গর্ভকালীন নিয়মিত চিকিৎসা না পাওয়াকে এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মো. আলিনুর আলী বলেন, “প্রতিবন্ধীদের মধ্যে শিশুর সংখ্যাটাই বেশি। কারণ অনেক পরিবার আছে যারা চিকিৎসা চাইতে পারে না। যাতায়াতের খুব কষ্ট।”

স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরাও বলছেন, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। যদিও নির্ভরযোগ্য সরকারি জরিপ নেই, তবু মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় তারা বিষয়টিকে “আশঙ্কাজনক” বলছেন।

মো. আলিনুর আলী বলেন, “চরাঞ্চলের বড় সমস্যা যোগাযোগব্যবস্থা। কোনো জরুরি রোগীকে হাসপাতালে নিতে গেলেও নৌকা ছাড়া উপায় থাকে না। অনেক সময় দুই থেকে তিন ঘণ্টা লেগে যায় নদী পার হতে। এছাড়াও, এখানে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতেই কষ্ট। গাড়িঘোড়ার সমস্যা, রাস্তার সমস্যা। এই জন্য মানুষ সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারে না।”

মাতৃস্বাস্থ্যসেবায় সরকারের সহায়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইউনিয়নে সীমিতসংখ্যক গর্ভবতী নারী ভাতা পান। “সরকার প্রতি মাসে নয়জন গর্ভবতী মায়ের জন্য ভাতা দেয়। কিন্তু দরকার তার চেয়ে অনেক বেশি”—বলেন আলিনুর আলী।

ঘোরজানে থাকা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের সুস্বাস্থ্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মী ও মিডওয়াইফ তাহরিমা বলেন, “আমরা যখন প্রথম ফিল্ডে যাইতাম, তখন প্রায় প্রতি এক-দুই ঘর পরপর একটা করে প্রতিবন্ধী বাচ্চা দেখতাম।”

গর্ভকালীন সেবার অভাব, ফলিক অ্যাসিড না খাওয়া, অপুষ্টি, প্রসবকালীন আঘাত, দীর্ঘসময় প্রসব আটকে থাকা এবং অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে শিশুর মস্তিষ্ক ও শারীরিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে তিনি জানান।

তাহরিমা বলেন, “সম্প্রতি একটা বাচ্চা জন্ম নিছে- দুইটা পা নাই। পরে জানা গেল মা ফলিক অ্যাসিড খায় নাই। এখানে তো অনেকে জানেই না গর্ভধারণ হইছে।”

তবে চিকিৎসকেরা বলছেন, প্রতিবন্ধিতার নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করতে মেডিকেল পরীক্ষা প্রয়োজন। শুধু পর্যবেক্ষণ দিয়ে কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

১২ বছরের হাসির জন্য বাবার দীর্ঘশ্বাস
ঘোরজান ইউনিয়নের ফুলহারা গ্রামের ১২ বছর বয়সী মোছা. হাসি খাতুন। কাগজে তার নাম আসমা খাতুন। জন্মের পর থেকেই সে শারীরিক জটিলতায় ভুগছে। ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারে না, স্বাভাবিক শিশুদের মতো বেড়ে ওঠেনি।

হাসির বাবা মো. হাসেম আলী বর্তমানে ঢাকায় শ্রমিকের কাজ করেন। তিন মেয়ের মধ্যে হাসিই বড়। ছোট দুই মেয়ে সুস্থ।

হাসেম আলী বলেন, “ডাক্তার কইছিল পুষ্টির অভাব। সময়মতো পুষ্টিকর জিনিস খাওয়াইতে হইত। কত কিছুই তো খাওয়াইলাম পরে, কিন্তু আর ঠিক হইলো না।”

হাসির মা সালমা তখন কিশোরী। গর্ভাবস্থার পুরো সময় নিয়মিত চিকিৎসাসেবা পাননি। হাসেম আলী জানান, আট মাসের দিকে একবার শাহজাদপুরে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঘোরজানে তখন কোনো স্বাস্থ্যসেবা ছিল না।

তিনি বলেন, “আমাগো এলাকায় তো ডাক্তারই নাই। হাসপাতাল থাকবো কোন জায়গায়?”

হাসির জন্মও হাসপাতালে হয়নি। বাড়িতেই প্রসব করানো হয়েছিল। এখন সে প্রতিবন্ধী ভাতা পায়। মাসে আড়াই হাজার টাকা। কিন্তু সেই টাকা দিয়ে চিকিৎসা, ওষুধ, যাতায়াত কিছুই ঠিকমতো হয় না।

হাসেম আলী বলেন, “আমার বাড়ির আশেপাশেও আরও দুইটা প্রতিবন্ধী বাচ্চা আছে।”

অল্প বয়সে বিয়ে, একের পর এক সন্তান জন্মদান
ঘোরজানের বিভিন্ন গ্রামে এখনো ১২-১৩ বছর বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক পরিবার মনে করে মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দিলে দায়িত্ব কমে। ফলে কিশোরী বয়সেই মা হয়ে যাচ্ছে অনেক মেয়ে।

ইউপি সদস্য আলিনুর আলী বলেন, “গরিব এলাকা হওয়ায় অনেক মেয়েই নিয়মিত লেখাপড়া করতে পারে না। অনেকে মাধ্যমিকের আগেই ঝরে পড়ে। খুব কম মেয়ে কলেজ পর্যন্ত যায়।”

তিনি আরও জানান, চরাঞ্চলে এখনো ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সেই অনেক মেয়ের বিয়ে ও মাতৃত্ব হচ্ছে। এতে মা ও নবজাতক উভয়ই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে।

তেগড়ি গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী আনোয়ারা খাতুন বলেন, “আমার তিন বেটা চার বেটি। তখন তো পরিবার পরিকল্পনা আছিল না। সবাই অনেক বাচ্চা নিত।”

প্রবীণ ধাত্রী আমেনা বেগম প্রায় ৩০ বছর ধরে প্রসব করাচ্ছেন এখানকার প্রসূতিদের। তিনি বলেন, “এইহানে প্রতিটা ঘরেই তিন-চারটা বাচ্চা তো আছেই। অনেকের ছয়-সাতটাও আছে।”

পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে কথা উঠতেই তিনি বলেন, “আগে কেউ এইসব মানত না। এখনো অনেক পুরুষ রাজি হয় না।”

স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, সন্তান জন্মের মধ্যে পর্যাপ্ত বিরতি না থাকলে মা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়েন। রক্তশূন্যতা, অপুষ্টি, উচ্চ রক্তচাপ ও প্রসব জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে।

গর্ভে সন্তান নিয়ে মাটি কাটার কাজ
ঘোরজানের অধিকাংশ নারী গর্ভাবস্থাতেও ভারী কাজ করেন। কেউ মাঠে কাজ করেন, কেউ মাটি কাটেন, কেউ পানি টানেন। বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ খুব কম।

সুস্বাস্থ্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মিডওয়াইফ সোহাগী খাতুন বলেন, “অনেক মা অতিরিক্ত শ্রম করেন। ফলে সাত-আট মাসেই ডেলিভারি হয়ে যায়। বাচ্চার ওজন থাকে এক কেজি, দেড় কেজি।”

কম ওজনের এসব শিশুর মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। কিন্তু চিকিৎসা ব্যয়, দূরত্ব আর অসচেতনতার কারণে অনেক পরিবার চিকিৎসা শেষও করে না।

অন্য আরেক স্বাস্থ্যকর্মী বলেন, “অনেক পরিবার ভাবে বাঁচলে বাঁচবে।”

এক কেজির শিশুকেও আইসিইউতে নেয়নি পরিবার
সাত মাসে জন্ম নেওয়া এক শিশুর ওজন ছিল মাত্র এক কেজি তিনশ গ্রাম। জন্মের পরপরই স্বাস্থ্যকর্মীরা পরিবারকে বলেছিলেন, দ্রুত নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) নিতে হবে। কিন্তু পরিবার রাজি হয়নি। তাদের ধারণা ছিল—‘বাচ্চা তো ভালোই আছে, হাসপাতালে নিয়া কী হইবো?’ দুই দিন পর শিশুটি মারা যায়।

মিডওয়াইফ তহরিমা ঘটনাটি স্মরণ করে বলেন, “মা গর্ভে বাচ্চা নিয়াও মাটি কাটতে গেছিল। সেখানে আঘাত পাওনের পর ব্যথা উঠে যায়। খুব কম ওজনের বাচ্চা আছিল। আমরা অনেক বুঝাইছিলাম আইসিইউতে নিতে। কিন্তু নেয় নাই।”

অনিরাপদ প্রসবের ভয়
চরাঞ্চলের অনেক প্রসূতির প্রসব এখনো বাড়িতে হয়। অনেক সময় প্রশিক্ষণহীন ধাত্রী দিয়ে প্রসব করানো হয়। প্রসব জটিল হলেও দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যায় না।

স্থানীয় এক ধাত্রী বলেন, “আগে তো ঘরেই বাচ্চা হইত। সমস্যা হইলেও হাসপাতালে নেওনের সুযোগ কম আছিল।”

মিডওয়াইফরা বলছেন, দীর্ঘক্ষণ প্রসব আটকে থাকা বা প্রসবের সময় আঘাত লাগলে শিশুর মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তারা আরও বলেন, “নরমাল ডেলিভারির সময় যদি বাচ্চা আটকা পড়ে বা অক্সিজেন কম পায়, পরে তার সমস্যা দেখা দিতে পারে।”

‘এই অঞ্চল শহর থেকে ৩০ বছর পিছিয়ে’
সুস্বাস্থ্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের প্রোগ্রাম অর্গানাইজার রেজাউল করিম রাজু মনে করেন, এ অঞ্চল শহর থেকে প্রায় ৩০ বছর পিছিয়ে আছে। তিনি বলেন, “অনেক পরিবার এখনো গর্ভাবস্থাকে রোগ মনে করে না। ফলে নিয়মিত পরীক্ষা, পুষ্টি বা ঝুঁকি শনাক্তের গুরুত্বও বোঝে না। এছাড়া অনেক গর্ভবতী নারী ছয়-সাত মাস পার হওয়ার পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসেন। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী গর্ভবতী মায়েদের অন্তত চারবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রথম তিন মাসে ফলিক অ্যাসিড সেবন জরুরি।”

তবে সম্প্রতি ইউনিয়নে মিডওয়াইফ নিয়োগের পর কিছু পরিবর্তন এসেছে। এখন অন্তত উচ্চ রক্তচাপ, একলাম্পসিয়া, পা ফুলে যাওয়া, ইউরিনে প্রোটিনের মতো ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্তের চেষ্টা হচ্ছে।

বর্তমানে ব্র্যাকের একটি ক্লিনিক সীমিত আকারে মাতৃস্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে জটিল রোগী বা অপারেশনের প্রয়োজন হলে রোগীদের নদী পাড়ি দিয়ে বড় ক্লিনিক বা হাসপাতালে পাঠাতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে কিছু আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়।

নদীপথের মতো বিপদসঙ্কুল মাতৃত্বের লড়াই
ঘোরজান ইউনিয়নের তরুণ গৃহবধূ মাহমুদা খাতুনের বয়স এখন আনুমানিক ২০ থেকে ২২ বছর। তিন বছর বয়সী এক কন্যাসন্তানের মা তিনি। এবার দ্বিতীয়বারের মতো সন্তানসম্ভবা। প্রথম সন্তান জন্মের সময় তাকে প্রসবব্যথা নিয়ে গভীর রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল শুধু হাসপাতালে যাওয়ার উপায় না থাকায়।

তিনি বলেন, “রাত ৩টার দিকে ব্যথা উঠছিল। সারারাত কষ্ট করছি। সকালে নিয়ে গেছে।”

সকাল হলে প্রথমে হেঁটে যেতে হয় ঘাটে, তারপর নৌকায় নদী পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে। পুরো যাত্রায় সময় লেগেছিল দুই থেকে তিন ঘণ্টা।

মাহমুদা বলেন, “বর্ষা আছিল তাই নৌকা পাইছি। পানি না থাকলে আরও কষ্ট হইত।”

গর্ভাবস্থায় নিয়মিত প্রসবপূর্ব সেবা কতটা জরুরি, সে বিষয়ে খুব বেশি ধারণা ছিল না তার। দ্বিতীয় গর্ভধারণের পরও প্রথম ছয় মাস তিনি কোনো চিকিৎসকের কাছে যাননি।

তিনি জানান, “ছয় মাস হওয়ার পরে প্রথম চেকআপে গেছি।”

এ পর্যন্ত মাত্র দুইবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়েছেন তিনি, যদিও একজন গর্ভবতী নারীর অন্তত চারবার প্রসবপূর্ব সেবা নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা।

গর্ভাবস্থাতেও সংসারের প্রায় সব কাজ করতে হয় মাহমুদাকে। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে গরু-ছাগল দেখাশোনা, মুরগির খামারের কাজ, সবই সামলাতে হয় তাকে।

তিনি বলেন, “ঘরের সব কাজই করি। গরু-বাছুর আছে, মুরগি আছে, রান্নাবান্নাও করি।”

ব্র্যাকের চর হেলথ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ফর মাদারস অ্যান্ড সোসাইটি (চার্মস) প্রকল্পের ব্যবস্থাপক মাহফুজার রহমান জানান, তারা এই এলাকায় দেড় বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করছেন। এর আগে এখানে কোনো নিয়মিত সেবা কাঠামো ছিল না বললেই চলে।

তিনি বলেন, এই জায়গায় কেউ সেবা দিত না। তাই আমরা সেন্টার চালু করেছি যাতে মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পায়।

মাহফুজার রহমান জানান, বর্তমানে এই চরাঞ্চলে গর্ভবতী নারীর সেবা গ্রহণের সংখ্যা প্রায় ৩৬০ জন। তবে, এখনো এদের মধ্যে একটা বড় একটি অংশ প্রসবের জন্য গ্রামের ধাত্রীদের ওপর নির্ভর করে। এতে জটিলতা বাড়ছে। আবার অনেকেই হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতে ডেলিভারি করায়। পরে সমস্যা হলে আমাদের কাছে আসে, কখনো কখনো তখন অনেক দেরি হয়ে যায়।

সু-স্বাস্থ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের তথ্য মতে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে একটি মাতৃমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং একাধিক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে, যার পেছনে দেরিতে হাসপাতালে আনা ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রসব প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চরাঞ্চলে প্রতিবন্ধী শিশু জন্মের পেছনে একক কোনো কারণ নয়, বরং একাধিক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা একসঙ্গে কাজ করছে। অল্প বয়সে বিয়ে ও মাতৃত্ব, অপুষ্টি, গর্ভকালীন চিকিৎসাসেবার অভাব, ফলিক অ্যাসিড না খাওয়া, অপরিণত প্রসব, প্রসবকালীন জটিলতা এবং জন্মের পর নবজাতকের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়া—সব মিলিয়েই ঝুঁকি বাড়ছে।

গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. লাভলী ইয়াসমিন জানান, গর্ভধারণের প্রথম তিন মাস মা ও শিশুর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়টাতে অনেক নারী বুঝতেই পারেন না যে তারা গর্ভবতী। আবার কেউ জানলেও লজ্জা, অসচেতনতা কিংবা স্বাস্থ্যকেন্দ্র দূরে হওয়ার কারণে চিকিৎসকের কাছে যান না। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ, পুষ্টি ও পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হন তারা।

বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের গাইনি ও প্রসূতি বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. সেহেরীন ফারহাদ সিদ্দিকা বলেন, “গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাস শিশুর মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ গঠনের সময়। এ সময় ফলিক অ্যাসিড না খেলে শিশুর জন্মগত জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, চরাঞ্চলের নারীদের বড় একটি অংশ এখনো বাড়িতেই সন্তান জন্ম দেন। অনেক সময় প্রশিক্ষণহীন ধাত্রী দিয়ে প্রসব করানো হয়। প্রসব জটিল হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগও থাকে না। নদীপথ, খারাপ যোগাযোগব্যবস্থা ও আর্থিক সংকটের কারণে চিকিৎসা নিতে দেরি হয়। এতে প্রসবকালীন আঘাত, শিশুর অক্সিজেনের ঘাটতি কিংবা অপরিণত প্রসবের ঝুঁকি বাড়ে।

তারা বলছেন, গর্ভকালীন অন্তত চারবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি গর্ভধারণের প্রথম তিন মাস থেকেই ফলিক অ্যাসিড ও আয়রন সেবন, পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ মায়েদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী জরুরি পদক্ষেপগুলো হলো- গর্ভধারণের প্রথম তিন মাসেই নিবন্ধন নিশ্চিত করা; ফলিক অ্যাসিড ও পুষ্টি সহায়তা বাড়ানো; কিশোরী বিয়ে প্রতিরোধ করা; বাড়িতে অনিরাপদ প্রসব কমানো; চরাঞ্চলে জরুরি মাতৃস্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করা এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য প্রাথমিক পুনর্বাসন ও চিকিৎসাসেবা চালু করা।

তাদের মতে, শুধু স্বাস্থ্যসেবা নয়, সচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি। পরিবারকে বুঝতে হবে, গর্ভাবস্থা কোনো সাধারণ বিষয় নয়, এটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও যত্নের বিষয়। বিশেষ করে দুর্গম চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মিডওয়াইফ, নৌ-অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি পরিবহনব্যবস্থা বাড়ানো না গেলে পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হবে।

নদীর ওপারে আটকে পড়া মাতৃত্ব
ঘোরজানের মায়েদের জন্য মাতৃত্ব এখনো এক অনিশ্চিত যাত্রার নাম। এখানে সন্তান জন্ম দেওয়া মানে শুধু নতুন জীবনের অপেক্ষা নয়; বরং নদী, কাদা, অন্ধকার, ভয় আর দেরির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই।

রাতের অন্ধকারে প্রসবব্যথা উঠলে অনেক পরিবার প্রথমেই আতঙ্কে পড়ে যায়-কীভাবে হাসপাতালে নেওয়া হবে? কোথায় নৌকা পাওয়া যাবে? নদীতে পানি আছে তো? ঝড়-বৃষ্টি হলে কী হবে?

অনেক নারী সময়মতো চিকিৎসা পান না। কেউ নৌকা না পেয়ে মাঝরাতে বাড়িতেই আটকে থাকেন। কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যথা সহ্য করেন। কেউ আবার হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সন্তান হারান।

চরের নারীদের অনেকেই গর্ভাবস্থাতেও ভারী কাজ করেন। সংসারের কাজ, গরু-ছাগল দেখাশোনা, পানি টানা, ক্ষেতের কাজ- সবকিছুই চালিয়ে যেতে হয়। বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার বা নিয়মিত চিকিৎসা অনেকের কাছেই বিলাসিতা।

অন্যদিকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংকটও প্রকট। অনেক এলাকায় এখনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। জরুরি প্রসূতি সেবা বা নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যার সুযোগও সীমিত। ফলে জটিল রোগীদের নদী পেরিয়ে উপজেলা বা জেলা শহরে যেতে হয়। কিন্তু সেই যাত্রাই অনেক সময় হয়ে ওঠে জীবন-মৃত্যুর লড়াই।

স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, চরাঞ্চলের অনেক পরিবার এখনো গর্ভাবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখে না। ফলে সমস্যা গুরুতর না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না তারা। দারিদ্র্য ও অসচেতনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

আর এই অবহেলা, দারিদ্র্য, দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসেবার সংকট ও ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেই জন্ম নিচ্ছে ঝুঁকিতে থাকা এক নতুন প্রজন্ম। কেউ জন্ম নিচ্ছে অপুষ্টি নিয়ে, কেউ জন্মগত জটিলতা নিয়ে, কেউ আবার জন্মের পরপরই হারিয়ে যাচ্ছে চিকিৎসার অভাবে।

ঘোরজানের চরগুলোতে তাই মাতৃত্ব এখনো নিরাপদ নয়; বরং প্রতিটি সন্তান জন্ম যেন একেকটি অনিশ্চিত অপেক্ষার গল্প।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর