ইউনূস সরকারের হঠকারিতার ধাক্কা সৌরবিদ্যুৎখাতে
শনিবার, ০৯ মে ২০২৬, ০৬:১১ PM

ইউনূস সরকারের হঠকারিতার ধাক্কা সৌরবিদ্যুৎখাতে

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯/০৫/২০২৬ ০৯:৪৭:৩৩ AM

ইউনূস সরকারের হঠকারিতার ধাক্কা সৌরবিদ্যুৎখাতে


ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের হটকারী সিদ্ধান্তের কারণে কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি দেশের অপার সম্ভাবনাময় সৌরবিদ্যুৎখাত। বিশ্লেষকরা বলছেন, যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো রাজনৈতিক দল তথা নেতাকর্মী নেই, সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক; সুতরাং তাদের রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করে এই খাতকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু তারা সেটি না করে বরং খাতকে পিছিয়েছে।

তাদের এক তরফা প্রকল্প বাতিলের ফলে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগ অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। এমনকি আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার পরও সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার একযোগে বাতিল করে তিন হাজার ৩শ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌর প্রকল্প। ইউনূস সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই (সেপ্টেম্বর ২০২৪) পূর্ববর্তী সরকারের আমলে সই হওয়া প্রায় ৩১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প (যার বেশিরভাগই ছিল সৌর) বাতিল করে। সরকারের যুক্তি ছিল, এগুলো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া (কুইক রেন্টাল আইনের অধীনে) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তবে এই একতরফা গণবাতিলের সিদ্ধান্তে কোনো অংশীজন কিংবা বিশ্লেষকের মতামত নেওয়া হয়নি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠান এইচডিএফসি সিন পাওয়ার লিমিটেডের স্থানীয় কর্ণধার গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) এসকেএম শফিকুল ইসলাম বলেন, ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক কোম্পানি আওয়ামী লীগ আমলে লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) পাওয়ার পর জমি ক্রয়, সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি), পরিবেশগত ছাড়পত্র, প্রাথমিক নকশা প্রণয়ন ও অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজে কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয় করেছিলেন। প্রকল্পগুলো বাতিল হওয়ায় এসব অর্থ প্রায় পুরোপুরি অপচয় হয়ে যায়। বিনিয়োগকারীরা শুধু আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীনই হননি, বরং দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা, সময় ও শ্রমও নষ্ট হয়েছে। অনেক বিদেশি কোম্পানি (বিশেষ করে চীন, সিঙ্গাপুর ও অন্যান্য দেশের) এই প্রকল্পগুলোতে যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিল, যার মোট সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এক্সপোটেক রিনিউয়েবল এনার্জি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. শামসুল আরেফিন বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার পটভূমি যাচাই না করেই একতরফাভাবে প্রায় তিন হাজার ৩শ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাতিল করে দেয়। এই প্রকল্পগুলো লেটার অব ইনটেন্ট পেয়েছিল এবং ৫টিরও বেশি প্রকল্প পিপিএ ও আইএ সম্পন্ন করেছিল। এই বাতিলের সিদ্ধান্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কতটা নিরুৎসাহিত করেছে, তার বড় প্রমাণ হচ্ছে ২০২৫ সালের ১৪ জুলাই সম্পন্ন হওয়া চারটি লটে ৫৪টি আন্তর্জাতিক দরপত্রে বিনিয়োগকারীরা অংশগ্রহণ বা অর্থায়নে আগ্রহ দেখায়নি। ফলে তৎকালীন সরকারকে বারবার সময়সীমা বাড়াতে হয়েছে, কিন্তু মেলেনি প্রত্যাশিত সাড়া। যদিও এই দরপত্রের শর্তগুলো অপেক্ষাকৃত নমনীয় ও সহজ ছিল, কারণ এখানে কোনো বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ), বাস্তবায়ন চুক্তি (আইএ) বা সার্বভৌম গ্যারান্টি ছিল না এবং এগুলো ব্যাংকযোগ্য ছিল না। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি আমানত গ্রহণ করে, কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলো ২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি। এই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বিশাল, যা সামাল দিতে দেশীয় ব্যাংকগুলো হিমশিম খাবে।

এমতাবস্থায় ‘বৈদেশিক বিনিয়োগই’ একমাত্র বিকল্প। কিন্তু এলওআই থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতায় এসে ইউনূস সরকার যখন একতরফাভাবে প্রকল্প বাতিল করে, তখন বিশ্বজুড়ে যে ভুল বার্তা যায়, এর ফলে আর কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান এখানে সৌর বিদ্যুতে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়নি, যার রেশ হয়তো বহুদিন টানতে হবে বাংলাদেশকে।

ড. শামসুল আরেফিন আরও মন্তব্য করেন যে, উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান কেবল সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের শুল্ক (ট্যারিফ) কমিয়ে ৭ থেকে ৮ দশমিক ৫ সেন্ট (যা অত্যন্ত কম) করেননি, বরং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করেছেন। ‘পিপিএ নব্বই দশকের ধারণা এবং বর্তমান সময়ের জন্য উপযুক্ত নয়’, উপদেষ্টার এমন অদূরদর্শী মন্তব্য এবং মানসিকতা ছিল অত্যন্ত ক্ষতিকর ও অবিবেচনাপ্রসূত।

এদিকে বাতিল হওয়া প্রকল্পের মালিকদের করা রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১০ জুলাই বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকার ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি রুল জারি করেন। রুলের বিষয়বস্তুতে বলা হয়, যে প্রকল্পগুলোতে ইতোমধ্যে জমি অধিগ্রহণসহ প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলোর সম্মতিপত্র (এলওআই) বাতিলের সিদ্ধান্ত কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ আইন বাতিল করে জারি করা অধ্যাদেশ কেন অসাংবিধানিক হবে না, তা জানতে চান আদালত।

রুলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সচিব, পিডিবি (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান ও সচিব এবং পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) সচিবকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। শুনানির সময় আদালতের পর্যবেক্ষণে প্রকল্পের জমিসংক্রান্ত প্রস্তুতি এবং বিনিয়োগকারীদের বিপুল পরিমাণ অর্থ (প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়।

এ প্রসঙ্গে গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) শফিকুল ইসলাম বলেন, যদিও আদালতের সেই পর্যবেক্ষণ তো দূরের কথা, নির্দেশনাও মানেননি তৎকালীন জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তার এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়, কারণ কোনো প্রকার পর্যালোচনা ও স্টাডি ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। যদি সুনির্দিষ্টভাবে প্রকৃত কোনো দুর্নীতি হয়ে থাকে, তবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া যেত।

বিদ্যুৎখাতকে দুর্নীতিমুক্ত করার দোহাই দিয়ে ইউনূস সরকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তটি জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, সে কারণেই ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ সরকার যখন এসব প্রকল্প পুনরায় মূল্যায়ন এবং ছাদে সোলার বা রুফটপ সোলার স্থাপনের মতো উদ্যোগ নেয়, তবুও বড় আকারের কোনো নতুন সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র সফলভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর