দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে সুরমা
রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:২৬ PM

দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে সুরমা

অতিথি প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৪/০৩/২০২৬ ১২:২০:৫০ PM

দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে সুরমা


একসময়ের নীল জলরাশির সুরমা আজ হারিয়েছে যৌবন, হারিয়েছে তার মোহিত করা নীল রং। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতার নহরে আজকর আজ স্থানে স্থানে অবহেলা, অনাদর আর দখলের শিকার। সুরমার রূপে মুগ্ধ হয়ে তিনি এর নাম দিয়েছিলেন নহরে আজরক। আরবিতে আজরক অর্থ নীল রং। আর নহরে আজরক অর্থ নীল রঙের নদী। এই নীল পানির নদীই আজকের সুরমা। ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে হজরত শাহজালাল র. এর সাথে দেখা করতে নহরে আজরক দিয়ে ইবনে বতুতা সিলেট আসেন। এই নদী আর সিলেটের প্রকৃতি তাকে মুগ্ধ করে।

কেবল ইবনে বতুতাই নয় নিকট অতীতেও এই সুরমার তীরে এসে প্রাণ জুড়াতেন নগরবাসী। কিন্তু সেই সুরমা এখন অনেকটাই মৃতপ্রায়। জায়গায় জায়গায় জমেছে চর, জমা হয় ময়লার স্তুপ। বর্ষা মৌসুমে এই অবস্থা তেমন বুঝা না গেলেও শুকনো মৌসুমে সরমার বুকের এই ক্ষত একেবারে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক জায়গায় দীর্ঘদিনের নদী শাসনের অবহেলায় মাঝনদী অব্দি চর এত শক্ত হয়ে বসেছে যে বর্ষার তীব্র স্রোতও তা সরাতে পারে না। এসব জায়গায় নদী ভরাট হয়ে এক তীর অপর তীরের সাথে প্রায় লেগে যাওয়ার মতো অবস্থা। আর বেশিরভাগ জায়গায় নদী একদিকে অর্ধেকের বেশি চর জমে ভরাট হয়ে গেছে। এসব জায়গায় দ্রুত খনন কার্যক্রম পরিচালনা না করলে তা আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা জানান সরকারি বড়ো প্রকল্পের আওতায় নদী খনন অনেক সময় ও নানান প্রক্রিয়ার ব্যাপার। এমতাবস্থায় বড়ো প্রকল্প প্রয়োজন তবে শুকনো মৌসুমে যেসব জায়গায় চর বেশি দেখা যায় এবং নদীর গতিপথ ব্যহত করে সে-সব জায়গায় সনাতন বা ছোটো প্রকল্প কিংবা উদ্যোগ নিয়ে খনন করা যায়। নগর কর্তৃপক্ষ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড আন্তরিক থাকলে তা করা সম্ভব।

আবহমান কাল ধরে এই নদীর সাথে মিতালী করে গড়ে উঠে এর তীরবর্তী জনপদগুলো। নদী তীরবর্তী জনপদগুলো গঞ্জ নামে পরিচিত। সুরমার তীরে গড়ে ওঠা জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, সিলেট সদর, দক্ষিণ সুরমা, বিশ্বনাথ, কোম্পানীগঞ্জ, দোয়ারাবাজর, ছাতক, সুনামগঞ্জ সদর, জামালগঞ্জ ধর্মপাশা নামীয় এই গঞ্জগুলো আজও সেই সাক্ষ্য বহন করে আসছে। ভারতের মণিপুর পাহাড়ে মাও সংসাং থেকে উৎপত্তি হওয়া বরাক নদী থেকে সুরমার উৎপত্তি। ১শ ৪৯ কিলোমিটারের দেশের দীর্ঘতম এ নদীর সাথে বৃহত্তর সিলেটের প্রকৃতি ও জীবনের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। জনশ্রুতি আছে রাজা ক্ষেত্রপালের স্ত্রী সুরম্যা এর নাম থেকেই এ নদীর নাম সুরমা।

এক সময় এই নদীই ছিল সিলেটের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। এ নদীতে মাছ ধরা হতো ঝাকিজাল, উড়াজাল, উথালজাল, হৈফাজাল, হাটজাল ও পেলুইনজালে। বড়ো বড়ো বাণিজ্যিক নৌকা পাল তুলে ছুটে যেতো এর বুক চিরে। সময়ের ভেলায় চড়ে সুরমার সেই রমরমা অবস্থা এখন আর নেই। চর জেগে, নাব্য হারিয়ে খরস্রোতা সুরমা এখন মৃতপ্রায়। কোনো কোনো জায়গায় নদী ছোটো নালার মতো অবশিষ্ট আছে। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে চতুর্দিকে।

সিলেট নগরীর মাছিমপুর শাহজালাল (র.) ব্রিজ থেকে কানিশাইল পর্যন্ত বেশ কয়েকটি স্থানে চর জমেছে। সবচেয়ে বেশি অবস্থা খারাপ দেখা গেছে কাজিরবাজার ব্রিজের কাছে পাগলা ঘাট নামক স্থানে। এখানে দেখা গেছে নদীর উত্তর থেকে প্রায় দক্ষিণ পাড়ের কাছাকাছি নদী ভরাট হয়ে গেছে শক্ত চরে। জমেছে আবর্জনা ও ময়লায় স্তুপ।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম চৌধুরী কিম জানান, নদীর কোন কোন জায়গায় ভরাট হয়েছে এবং চর জমেছে তা সবচেয়ে ভালো বুঝা যায় শুকনো মৌসুমে। এসময় নদীর পানি কমে যাওয়ায় ভরাটের জায়গাগুলো ভেসে ওঠে। ইদানীং সুরমার যেসব জায়গায় চর জমেছে দেখা যাচ্ছে সেগুলো অনেকদিনে জমে শক্ত হয়ে গেছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে তীব্র স্রোতেও তা সরে না। তাই এই শুকনো মৌসুমে সে-সব জায়গা খনন করা খুব জরুরি ছিল। তবুও হাতে যা সময় আছে তা কাজে লাগানো দরকার।

তিনি বলেন, শুকনো মৌসুমে পানি কমে যাওয়ায় এগুলো দৃশ্যমান হয়েছে। যা প্রবল পানির স্রোতেও যাওয়া সম্ভব নয়। সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড চাইলে ছোটো ছোটো প্রকল্প বা উদ্যোগের মাধ্যমে দৃশ্যমান জায়গাগুলো খনন করতে পারে। শুকনো মৌসুমেই এগুলো করার সবচেয়ে ভালো সময়। এতে নদীর গতিপথ সচল থাকে এবং ভরাট কিছুটা রোধ হয়।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর