সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের এক কোণে চার শিশু খেলায় ব্যস্ত। বাইরে হাসপাতালের করিডরে মানুষের ভিড়, চিৎকার আর আহাজারি। কিছুই যেন স্পর্শ করছে না তাদের।
ঠিক পাশের বেডে আহত অবস্থায় শুয়ে আছেন তাদের মা হাফিজা বেগম (৩০)। মাঝে মধ্যে নিঃশব্দে তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। কারণ একই হাসপাতালের অন্য ভবনের মর্গে ফ্রিজিং অবস্থায় রাখা তার চার শিশুর বাবা বদরুল আমিনের (৩৪) নিথর দেহ।
অবুঝ চার সন্তান এখনো জানে না এই হাসপাতালের দুই ভিন্ন কক্ষে তাদের জীবনের গল্প দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে মায়ের বেঁচে থাকার লড়াই, অন্যদিকে বাবার চিরবিদায়।
রোববার সকাল ৬টা ২৫ মিনিটের দিকে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমায় শ্রমিকবাহী একটি পিকআপ ও বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে একই সঙ্গে ৮ নির্মাণ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৭ জন। যার মধ্যে রয়েছেন নিহত বদরুল আমিন এবং আহত হাফিজা বেগম।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বদরুল আমিন নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতেন। জীবিকার তাগিদে তিনি প্রায়ই স্ত্রী হাফিজা বেগমকে সঙ্গে নিয়েই বিভিন্ন কাজে যেতেন। আজও তারা স্বামী-স্ত্রী একই সঙ্গে ওই পিকআপে কাজের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। দুর্ঘটনায় স্বামী বদরুল প্রাণ হারালেও গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন স্ত্রী হাফিজা বেগম।
বদরুলের চার সন্তান তামিম (১১), জুবায়ের (১০), তানিয়া (৯) ও তাকরিম (৬) এখনো বুঝে উঠতে পারছে না তাদের বাবা আর কখনো ফিরে আসবে না।
সিলেটের জালালাবাদ থানার লালারগাঁও এলাকার বাসিন্দা সুজাত আলীর ছেলে বদরুল আমিন দীর্ঘদিন ধরে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। অভাব-অনটনের মধ্যেও কখনো হাল ছাড়েননি। কিছুদিন আগেই নতুন আশায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে নগরের ভাতালিয়া এলাকায় উঠেছিলেন তিনি। নির্মাণ শ্রমিক পেশায় যোগ দেন।
কিন্তু এক মুহূর্তের সড়ক দুর্ঘটনায় বদরুলেন জীবনের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান বদরুল, আর তার স্ত্রী এখন আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি।
হাফিজার চাচা আব্দুর রহিম বলেন, সে এখনো ঠিকভাবে কথা বলতে পারছে না। স্বামীকে হারিয়ে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। চারটা ছোট বাচ্চা নিয়ে কী হবে এই চিন্তায় আমরা সবাই দিশেহারা।
নিহতের দুলাভাই আকবর আলী বলেন, বদরুল ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল মানুষ। দিন-রাত খেটে সংসার চালাত। এমন একজন মানুষকে এভাবে হারাতে হবে, আমরা কখনো ভাবিনি। এই দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের জীবনই কেড়ে নেয়নি ভেঙে দিয়েছে একটি পরিবার।
এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়রা দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, পিকআপে থাকা শ্রমিকরা সুনামগঞ্জে নির্মাণ কাজে যাচ্ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনায় পিকআপ ও ট্রাকের চালক পলাতক রয়েছেন। বাকি নিহতরা হলেন- নিহতদের মধ্যে ৪ জনের নাম পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন- সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের সুরুজ আলী (৬০), একই উপজেলার শেষস্তি গ্রামের আব্দুল বাসিরের মেয়ে মোছা. মুন্নি (৩৫), সিলেটের জালালাবাদ থানার লালারগাঁও এলাকার সুজাত আলীর ছেলে মো. বদরুল এবং দিরাই উপজেলার নুরনগর এলাকার মৃত নূর সালামের ছেলে মো. ফরিদুল (৩৫)। অন্য ৪ জনের নাম পরিচয় এখনও শনাক্ত করা যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আজকের সিলেট/এপি
আজকের সিলেট ডেস্ক 








