শামীমুর রহমান। বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন থানার কমলাপুর এলাকায়। ঢাকার মুহাম্মদপুর এলাকার সাতমসজিদ হাউজিংয়ে বসবাস করতেন তিনি। নিজেকে সংসদ সদস্য পরিচয় দিয়ে বিস্তার করেছিলেন প্রতারণার জাল। তার প্রতারণা থেকে রেহাই পাননি সিলেট বিভাগের মানুষও।
শামীমুরকে কল দিলে ফোনের ট্রুকলারে ভেসে উঠতো ‘এমপি মিজানুর’। অথচ তিনি সংসদ সদস্যই নন। সম্প্রতি সংসদ সদস্য সেজে সরকারিভাবে চাকরি দিয়ে ৪০ জনকে কসোভো পাঠানোর কথা বলেন। পরে সংসদ ভবনে ডেকে এনে তাদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন। নিজের স্ত্রী মৌটুসীকে কসোভো দূতাবাসের ডেলিগেট সাজিয়ে সাক্ষাৎকার বোর্ডেও পাঠান।
সর্বোপরি চমকে যাওয়ার মতো তথ্য হচ্ছে- সাংসদ না হয়েও সংসদ ভবনের ভেতরেই চাকরিপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেন। মেডিকেল ফি ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স বাবদ হাতিয়ে নেন টাকা। একপর্যায়ে তাদের কাজকর্মে সন্দেহ জাগে ভুক্তভোগী চাকরিপ্রত্যাশীদের। খোঁজ নিয়ে দেখেন- তারা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। তাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পরে পুলিশ সংসদ ভবনের ভেতর থেকে ভুয়া এমপি মিজানুর, তার স্ত্রী মৌটুসী রহমান ও পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাবের কম্পিউটার অপারেটর রাহুল হোসেনকে আটক করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শামীমুর রহমান নিজেকে এমপি পরিচয়ে একটি ম্যানপাওয়ার এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে এজেন্সির প্রতিনিধিকে সংসদ ভবনে ডেকে নিয়ে তিনি আলোচনা করেন। এ সময় তিনি সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদস্থদের কথা বলে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করেন। এজেন্সি তাদের ৪০ গ্রাহককে কসোভোতে পাঠাতে আগ্রহী হয়। শামীমুরের কথামতো ৩৯ জনের পাসপোর্ট জমা দেন। পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাবের কম্পিউটার অপারেটর রাহুলের সংগ্রহ করা গেট পাস দিয়ে গত ২ মার্চ বিদেশ গমনেচ্ছুরা সংসদ ভবনে প্রবেশ করেন। ওইদিন তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এরপর এজেন্সি প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দারস্থ হয়। পরে সংসদ ভবন থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগীদের একজন মেহেদী হাসান। ওই মামলায় গত সোমবার তিন আসামিকে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড চান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আনোয়ার হোসেন খান। আদালত শামীমুর রহমান ও রাহুল হোসেনের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে শামীমুরের স্ত্রী মৌটুসীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯ ফেব্রুয়ারি রাহুল হোসেনের মাধ্যমে পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাবের কম্পিউটার রুমে বিদেশে গমনেচ্ছুদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। তখন মেডিকেল ফি বাবদ ৪০ জনের কাছ থেকে ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। একই সময়ে ২৩ জনের জরুরি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স বাবদ আরও ৯২ হাজার টাকা নেন ভুয়া এমপি মিজানুর। কসোভো দূতাবাস থেকে একটা টিম চাকরিপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নিতে আসবে বলেও জানানো হয়। গত ২ মার্চ সিলেকশন করে দেওয়ার কথা বলে সংসদ ভবনের মেটসেফ রেস্টুরেন্টে বসে ১৫ জনের কাছে থেকে নেন ৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
আরও জানা গেছে, সাক্ষাৎকারের সময় কোনো ডেলিগেট না থাকায় বিদেশ গমনেচ্ছুদের সন্দেহ হয়। তখন তারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন- শামীমুর রহমানের এমপি পরিচয়টা ভুয়া। সাক্ষাৎকার বোর্ডে ডেলিগেট পরিচয়ে থাকা নারী ভুয়া এমপি শামীমুরের স্ত্রী। তাদের সহযোগী রাহুল পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাবে মাস্টার রোলে নিয়োগপ্রাপ্ত কম্পিউটার অপারেটর।
প্রতারণার শিকার হয়েছেন বুঝতে পেরে বিদেশ গমনেচ্ছুরা ‘এমপি মিজানুর’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি তাদের বাকি টাকা নিয়ে আসতে বলেন। গত ৩ মার্চ সংসদ ভবনের পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাবে গিয়ে শামীমুরের প্রতারণার বিষয়টি সংসদ ভবনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের জানান বিদেশ গমনেচ্ছুরা। পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে তাকেসহ তিনজনকে আটক করে।
এ তিন প্রতারকের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জের আমিনুল হক, বরগুনার মেহেদি হাসান ও নাটোরের নাহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন।
মেহেদী হাসান সাংবাদিকদের জানান, এমপি পরিচয়ে তাদের কাছে থেকে ১৬ লাখ ৯২ হাজার টাকা ও ৩৯ জনের পাসপোর্ট হাতিয়ে নিয়ে গেছে শামীমুর রহমান।
আজকের সিলেট /ডি/কে.আর
আজকের সিলেট ডেস্ক 








