জিয়াউর রহমানের পথেই হাঁটছেন তারেক রহমান
বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৬:০৫ PM

জিয়াউর রহমানের পথেই হাঁটছেন তারেক রহমান

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬/০২/২০২৬ ০৯:৪৬:৩৫ AM

জিয়াউর রহমানের পথেই হাঁটছেন তারেক রহমান


বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কৌশল, দলীয় সংস্কার এবং জনসম্পৃক্ততার ধরন নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলের ভেতরে-বাইরে একটি আলোচনা জোরালো হচ্ছে: তিনি কি তার পিতা এবং দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের পথ অনুসরণ করছেন?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একটি বিশেষ ধারার প্রবর্তক ছিলেন, যাকে বলা হয় বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। দীর্ঘ প্রবাস জীবন এবং দলের কঠিন সময়ে নেতৃত্ব দিয়ে তারেক রহমান এখন বিএনপির একক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। সাম্প্রতিক সময়ে তারেক রহমানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, তৃণমূলের সঙ্গে সংযোগ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের পরিকল্পনাগুলো বিশ্লেষণ করলে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বাবার মতোই সাদামাটা জীবনযাপন পছন্দ করেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার কিছু সিদ্ধান্ত দেশের জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপির জয়ী সংসদ সদস্যরা সরকারি সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট নেবেন না। সরকারি গাড়ি, চালক ও জ্বালানি ব্যবহার না করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চলাচল, প্রটোকল কমানো এবং শনিবারেও তারেক রহমানের অফিস করার সিদ্ধান্ত জনমনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আর যানজটের শহরে নিজের প্রটোকল কমিয়ে আনা এবং প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের সময় সড়কের দুই পাশে পুলিশের সারিবদ্ধ অবস্থান নেওয়ার প্রথা বাতিল করার সিদ্ধান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার ঝড় তুলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন ক্ষমতার উৎস হলো জনগণ, বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদ। তিনি পায়ে হেঁটে গ্রামগঞ্জে যেতেন এবং সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলতেন। তারেক রহমানও গত কয়েক বছর ধরে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে সরাসরি কথা বলছেন। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার আগে দেশজুড়ে জনগণের মাঝে মিশে গেছেন তারেক রহমান।

এতে করে জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন তিনি। আবালবৃদ্ধবনিতা সকলের কাছে জনপ্রিয়তায় শীর্ষে রয়েছেন তারেক রহমান। তিনি যেখানেই যাচ্ছেন, শিশুরাও তাকে জড়িয়ে ধরছে; এ যে জিয়াউর রহমানের প্রতিচ্ছবি।

বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের আইটিতে কর্মরত মো. আসিফ বলেন, আমার এই জীবনে তিনবার আমি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে করমর্দন করেছিলাম, যা আমার স্মৃতি কোঠায় অম্লান হয়ে আছে। বরিশাল জেলা স্কুলে পড়তাম, সেখান থেকে বানারীপাড়ায় খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধনের দিন আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে প্রথমবার আমি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে করমর্দন করি। এরপর বরিশাল সার্কিট হাউজের গা ঘেঁষে আমাদের স্কুল ছিল, তিনি সার্কিট হাউজে এসেছিলেন, বের হওয়ার সময় তিনি ভেতর থেকে গাড়িতে না উঠে হাঁটতে হাঁটতে বাইরে চলে এলেন, আমরা স্কুল মাঠে ছিলাম আমাদের সঙ্গে করমর্দন করলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শিশুদের ভালোবাসতেন, আমাদের উদ্দেশ্য করেই সেদিন তিনি গাড়িতে না চড়ে পায়ে হেঁটে চলে আসেন। তৃতীয় বার, বরিশাল কসাই মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম, তখন রাষ্ট্রপতিও ওই মসজিদে নামাজ আদায় করতে যান। নামাজ শেষে আমরা সবাই সারিবদ্ধ হয়ে দুটো লাইন করে দাঁড়িয়ে যাই, তিনি বের হওয়ার সময় আমাদের সঙ্গে করমর্দন করেন। আজ তারই সন্তান যেখানেই যাচ্ছেন, শিশুরা সেখানে ভিড় করছেন। তিনিও শিশুদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন করমর্দন করছেন, কথা বলছেন—এ এক অন্যরকম অনুভূতি!

জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে উন্নয়নের অংশীদার করেছিলেন, তারেক রহমান তেমনি রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। তিনি নির্বাচিত হওয়ার আগে বারবার বলেছেন, ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনাই মূল লক্ষ্য, যা জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চেতনার সাথে সংগতিপূর্ণ ছিল।

তাঁতী দল ঢাকা মহানগরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান মো. ইসমাইল বলেন, তারেক রহমান রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। জিয়াউর রহমানের ১৯ দফাও ছিল একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনের হাতিয়ার হিসেবে। ৩১ দফায় একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনে সব বিষয়গুলো উঠে এসেছে বলে তিনি মনে করেন।

জিয়াউর রহমান বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে জাতীয় সংহতির ডাক দিয়েছিলেন। তিনি বাম-ডান সব মতাদর্শের মানুষকে এক ছাতার নিচে এনে বিএনপি গঠন করেছিলেন। তারেক রহমানও আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে একটি যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, যার ফলে ৫ আগস্টের জন্ম নেয় বলে মনে করেন মিরপুরের বাসিন্দা কবির হোসেন। তিনি বলেন, একদিনেই ৫ আগস্টের জন্ম হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে এটিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন তারেক রহমান। তিনি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন, যার ফল আমরা ৫ আগস্টের মাধ্যমে পেয়েছি।

জিয়াউর রহমানের রাজনীতিতে একটি কঠোর শৃঙ্খলার ছাপ ছিল। তারেক রহমানও গত কয়েক বছরে দলের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দখলদারি বা বিশৃঙ্খলার অভিযোগ ওঠার সাথে সাথে তারেক রহমান নজিরবিহীন কঠোরতা দেখিয়েছেন। শত শত নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়, যা অতীতে কোনো রাজনৈতিক দলে দেখা যায়নি। এই কঠোরতা প্রমাণ করে যে, তারেক রহমান তার পিতার মতোই একটি সুশৃঙ্খল দল গঠন করতে চান। তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন দলের পরিচয় ব্যবহার করে কোনো অপকর্ম করলে ছাড় দেওয়া হবে না, যা জিয়াউর রহমানের শৃঙ্খলার রাজনীতির কথা মনে করিয়ে দেয়।

তারেক রহমান তার প্রতিটি বক্তব্যে তরুণদের কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার কথা বলছেন। তিনি বোঝেন যে, আজকের তরুণরা কেবল সস্তা স্লোগান চায় না, তারা চায় বৈশ্বিক বাজারের উপযোগী দক্ষতা। তিনি তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন, যা জিয়ার স্বনির্ভর বাংলাদেশ স্বপ্নের আধুনিক রূপ।

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও পররাষ্ট্রনীতি
জিয়াউর রহমান যেমন ভারতের সাথে সমমর্যাদার সম্পর্ক এবং মুসলিম উম্মাহর সাথে ভ্রাতৃত্ব চেয়েছিলেন, তারেক রহমানও তার বক্তব্যে জাতীয় স্বার্থ রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ার কথা বলছেন, যা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারেক রহমান কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে নেতা নন, বরং তিনি তার রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন যে, তিনি জিয়ার আদর্শের বাহক। জিয়াউর রহমান যেমন শূন্য থেকে একটি জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তারেক রহমানও ধ্বংসপ্রায় রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেই পথেই হাঁটছেন। তবে এই পথের শেষ সফলতায় পৌঁছাতে হলে তাকে জিয়াউর রহমানের মতো সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখা এবং দলের ভেতরে সংস্কার অব্যাহত রাখার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন একাধারে একজন সমরনায়ক এবং আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি। তার প্রবর্তিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং ১৯ দফা কর্মসূচি এদেশের রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছিল। দীর্ঘ সময় পর তার পুত্র এবং বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখন দেশ ও দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে একটি প্রশ্নই বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে তারেক রহমান কি তার পিতার সেই হারানো গৌরব ও দর্শনের পথেই হাঁটছেন? সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, রাষ্ট্র সংস্কার এবং তৃণমূলের সাথে তার নিবিড় যোগাযোগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি কেবল উত্তরাধিকার বহন করছেন না, বরং জিয়াউর রহমানের আদর্শকে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী করে পুনর্গঠন করছেন।

তারেক রহমান কেবল জিয়াউর রহমানের রক্ত বহন করছেন না, তিনি তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতাকেও ধারণ করার চেষ্টা করছেন। সময় বদলেছে, প্রেক্ষাপট বদলেছে, তাই জিয়ার ১৯ দফা আজ তারেক রহমানের ৩১ দফায় রূপান্তরিত হয়েছে। তার তৃণমূলমুখী রাজনীতি এবং দলের ভেতর কঠোর শৃঙ্খলা প্রমাণ করে যে, তিনি তার পিতার দেখানো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পথেই হাঁটছেন। ইতিহাস যদি বারবার ফিরে আসে, তবে তারেক রহমান নিজেকে জিয়ার এক যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করার পথে রয়েছেন।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর