কাগজে–কলমে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজের অগ্রগতি ৬৫ শতাংশ। তবে মাঠের চিত্র ভিন্ন। অনেক জায়গায় এখনো চলছে মাটি কাটার কাজ। শুরু হয়নি বাঁধের ঢালাই। কমপেকশন, মাটি বসানো কিংবা ঘাস লাগানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনও অনেক বাকি। এর মধ্যে বরাদ্দের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ না পাওয়ায় ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার একাধিক প্রকল্পের কাজ কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে হাওরের বোরো ফসল রক্ষা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে শঙ্কা ও ক্ষোভ। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হওয়া নিয়েও বাড়ছে শঙ্কা।
‘কাবিটা নীতিমালা–২০২৩’ অনুযায়ী, প্রতি বছর ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বাঁধের কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আগাম বন্যা থেকে বোরো ফসল রক্ষায় সরকার প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এবার প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকায় তদারকিতে ঘাটতি পড়েছে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ৯ থেকে ১৩ নম্বর পিআইসি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ফুলবড়ি ও কাটাখালি গ্রামসংলগ্ন বাঁধ, হরিমইন্না বাঁধ ও বেকাবাঁধে এখনো মাটির কাজ চলছে। ক্লোজার অংশে বাঁশের আড় বসানো, দুরমুজ দেওয়া ও ঘাস লাগানোর কাজ শুরু হয়নি।
ফুলবড়ি-কাটাখালি গ্রামের কৃষক তাহির আলী বলেন, অনেক জায়গায় এখনো মাটির কাজ বাকি। বৃষ্টি নামলে আর কাজ করা যাবে না। এইভাবে হলে এক মাসেও শেষ হবে না।
সুমন বনিক বলেন, মাটি ফেলার কাজ শেষ হয়নি, এরপর ফিনিশিং ও ঘাস লাগানো বাকি। আমরা চাই, মেঘ-বৃষ্টি আসার আগেই কাজ শেষ হোক।
আবু তাহের বলেন, এই অগ্রগতিতে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হওয়া সম্ভব নয়।
কৃষক কবির হোসেন বলেন, মাটির কাজের সঙ্গে সঙ্গে ঘাস লাগানো দরকার ছিল। পরে লাগালে তা টিকবে না।
ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার ৯টি হাওরে মোট ১৩৪টি প্রকল্পের কাজ চলছে। ধর্মপাশায় ৯৩টি প্রকল্পে বরাদ্দ ২০ কোটি ১৭ লাখ টাকা এবং মধ্যনগরে ৪১টি প্রকল্পে বরাদ্দ ৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। চার কিস্তিতে অর্থ ছাড়ের নিয়ম থাকলেও এখনো দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড় হয়নি বলে অভিযোগ পিআইসি সদস্যদের।
সরেজমিনে অন্তত ৩৫টি প্রকল্প ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ স্থানে মাটির কাজ প্রায় শেষ হলেও ঢালাই ও দৃঢ়করণের কাজ সঠিকভাবে হয়নি। ৩৫টির মধ্যে ৩০টিতেই প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কাউকে পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন পিআইসি সভাপতি ও সদস্য সচিব বলেন, সময়মতো টাকা না পেয়ে ধারদেনা করে কাজ চালাতে হয়েছে। পাওনাদারের চাপের কারণে তাঁরা কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন।
৯ নম্বর পিআইসি’র সভাপতি রতিন্দ্র বর্মণ বলেন, ঠিকমতো বিল পাচ্ছি না। টাকা জোগাড় করতে গিয়েই কাজের গতি কমে গেছে।
হাওরপাড়ের কয়েকজন কৃষক বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকদের গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে বরাদ্দের টাকায় টালবাহানা চলে। তাঁরা স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৭ সালে বাঁধে গাফিলতির কারণে হাওরে বোরো ফসলডুবির ঘটনা ঘটে। “সেই দৃশ্য আর দেখতে চাই না,” বলেন এক কৃষক।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, পিআইসি প্রথাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ঠিকাদারি পদ্ধতিতে ফেরার উদ্দেশ্যে কাজে ধীরগতি রাখা হচ্ছে। আমরা পরিদর্শন করেছি বিভিন্ন বাঁধে ইচ্ছে করেই দায়সারাভাবে কাজ করা হচ্ছে। আমার মনে হয়না নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ হবে।
ধর্মপাশার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনি রায় বলেন, দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ না আসায় পিআইসিরা সংকটে পড়েছেন। বিষয়টি জেলা কমিটিকে জানানো হয়েছে। দ্রুতই কিস্তির টাকা পেয়ে যাবেন।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, এ বছর ৭১০টি পিআইসির মাধ্যমে ৬০১ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের কাজ চলছে। সার্বিক অগ্রগতি ৬৫ শতাংশ এবং ক্লোজারের অগ্রগতি ৭৩ শতাংশ। প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়ের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে আমরা চেষ্টা করছি।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি 








