সিলেটের প্রাচীন ও সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ ‘তাল ইফতারি’। বিশেষ করে রমজান মাস এলে নতুন বিবাহিতা মেয়ের বাড়িতে বাপের বাড়ি থেকে ইফতার সামগ্রী পাঠানোর এই প্রথা এক সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় জগন্নাথপুর উপজেলা-র বিভিন্ন গ্রামে এখন চলছে মেয়ে কিংবা বোনের বাড়িতে ইফতারি পাঠানোর ধুম।
সিলেটি ভাষায় একে বলা হয় ‘ইফতারি দেওয়া’ বা ‘তাল পাঠানো’। বিয়ের পর মেয়ের প্রথম রমজানে বড় পরিসরে ইফতারি পাঠানো সামাজিক শিষ্টাচারের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। শুধু ইফতার নয়, এর সঙ্গে থাকে নানা পদের মিষ্টি, ফলমূল এবং ঐতিহ্যবাহী পিঠা-পুলি।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, রমজানের শুরু থেকেই চলছে প্রস্তুতি। সাজানো থালা বা বাঁশের ডালায় করে বড় বড় জিলাপি, বাখরখানি, নিমকি, খেজুর, আম-কাঁঠালসহ মৌসুমি ফল ও রকমারি ইফতার সামগ্রী ভ্যান বা গাড়িতে করে পাঠানো হচ্ছে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে।
স্থানীয়দের মতে, এটি কেবল একটি প্রথা নয়; বরং দুই পরিবারের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্পর্ক দৃঢ় করার একটি মাধ্যম। মেয়ের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের মাঝেও এই ইফতারি বিতরণ করা হয়, যা এলাকায় উৎসবের আমেজ সৃষ্টি করে।
উপজেলার প্রবীণদের ভাষ্য, ‘এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের আমল থেকে চলে আসা সামাজিক সংস্কৃতি। রমজান ত্যাগ ও সংযমের মাস। উপহার বিনিময়ের মাধ্যমে ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।’
তবে আধুনিক সময়ে এই প্রথার জৌলুস বাড়লেও, অনেক ক্ষেত্রে তা আভিজাত্যের প্রতিযোগিতায় রূপ নিচ্ছে-এমন অভিযোগ রয়েছে সচেতন মহলে। নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ‘তাল ইফতারি’ অনেক সময় বড় আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়ায়। রমজান আসার দুই-তিন মাস আগ থেকেই অনেক পরিবারকে ইফতার পাঠানোর অর্থ জোগাড়ের চিন্তায় পড়তে হয়। কেউ কেউ গরু-ছাগল বা হাঁস-মুরগি বিক্রি করেন, আবার অনেকে সুদে টাকা ধার করে এই আয়োজন সম্পন্ন করেন।
এছাড়া মেয়ের শ্বশুরবাড়ির চাহিদা অনুযায়ী ঈদের পোশাক পাঠানোর রেওয়াজও অনেক ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করছে। সামর্থ্য না থাকলেও মেয়ের সুখ-শান্তির কথা ভেবে অনেক বাবা-মা কষ্ট সহ্য করে ইফতার পাঠান।
আলেম-উলামাদের একটি অংশ এই প্রথাকে ‘জুলুম’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর সংস্কার বা অবসানের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, ইবাদতের মাসে এমন আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা ইসলামসম্মত নয়।
সচেতন মহলের অভিমত, ঐতিহ্য হিসেবে ‘তাল ইফতারি’ ইতিবাচক দিক বহন করলেও, তা যেন সামাজিক বাধ্যবাধকতা বা প্রতিযোগিতায় পরিণত না হয়-সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি 








