আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সারাদেশের মতো সিলেটেও জমে উঠেছে নির্বাচনী উত্তাপ। ভোটের মাঠে এখন প্রচার-প্রচারণা তুঙ্গে। প্রার্থী ও তাদের সমর্থকেরা নাওয়া-খাওয়া ভুলে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, রাজনৈতিক সমীকরণ আর কৌশলগত অবস্থানের কারণে প্রতিটি আসনেই সৃষ্টি হয়েছে টানটান উত্তেজনা। জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে সিলেট-৫ আসন এবার বিশেষভাবে আলোচনায়; কারণ এখানে স্পষ্টভাবে একটি ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
সিলেট-৫ আসনটি জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট; এই দুইটি সীমান্তবর্তী উপজেলা নিয়ে গঠিত। ঐতিহাসিকভাবে এ আসনটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। স্বাধীনতার পর থেকে এ আসনে চারবার আওয়ামী লীগ, তিনবার জাতীয় পার্টি, দুইবার স্বতন্ত্র এবং একবার করে বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। অর্থাৎ, এখানে কোনো একটি দলের একক আধিপত্য দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং সময়, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও জোট সমীকরণ অনুযায়ী ভোটের ফল পাল্টে গেছে বারবার।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসে এই আসনে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াত দেশের দুটি বড় রাজনৈতিক দল; এবার নিজেদের কোনো প্রার্থী দেয়নি। তারা জোটগতভাবে ভিন্ন ভিন্ন প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছে। এর ফলে ঐতিহ্যবাহী দলীয় প্রতিযোগিতার পরিবর্তে ভোটের মাঠে তৈরি হয়েছে ব্যক্তি, সংগঠন ও ভোট ব্যাংক নির্ভর ত্রিমুখী লড়াই।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সমর্থন দিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে, যিনি খেজুর গাছ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সমর্থন দিয়েছে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুফতি মোহাম্মদ আব্দুল হাসানকে, যার প্রতীক দেওয়াল ঘড়ি। পাশাপাশি সিলেট জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি (বহিষ্কৃত) মামুনুর রশীদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে ভোটের মাঠে তিনটি শক্তিশালী বলয় মুখোমুখি অবস্থানে।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খেজুর গাছ, ফুটবল ও দেওয়াল ঘড়ি; এই তিন প্রতীকের প্রার্থীর মধ্যেই মূল প্রতিযোগিতা সীমাবদ্ধ থাকবে। কারণ এই তিনজনেরই নিজস্ব ভোট ব্যাংক রয়েছে এবং তাদের পেছনে রয়েছে শক্ত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের সমর্থন। অন্য প্রার্থীরা প্রচারণায় থাকলেও ভোটের সমীকরণে তারা প্রভাব ফেলতে পারবেন; এমনটা মনে করছেন না ভোটাররা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রচারণায় কিছুটা এগিয়ে রয়েছেন বিএনপি জোট সমর্থিত প্রার্থী মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক। বিএনপির নেতাকর্মীরা তাঁর পক্ষে দিনরাত মাঠে কাজ করছেন। পাশাপাশি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ নীরবে হলেও তাঁর পক্ষে সক্রিয় রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো; উপমহাদেশের প্রখ্যাত বুযুর্গ ফুলতলী পীরের দরবারের সমর্থন তিনি পেয়েছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে। এই দরবারের অনুসারীরা সিলেট অঞ্চলে একটি বড় ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত, যা উবায়দুল্লাহ ফারুককে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন) কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের একটি বড় অংশ তাঁর পক্ষে মাঠে কাজ করছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। ছাত্ররাজনীতি ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার কারণে তিনি তরুণদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পেরেছেন। সূত্র জানায়, কওমি ঘরানার একটি পক্ষও তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ভোট নিজের বাক্সে নিতে তিনি সক্রিয় তৎপরতা চালাচ্ছেন, যা তাঁকে এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে শক্ত অবস্থানে রাখছে।
অন্যদিকে জামায়াত জোটের প্রার্থী মুফতি মোহাম্মদ আব্দুল হাসানও দিনরাত প্রচারণায় ব্যস্ত। তিনি নিয়মিত ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন এবং সংগঠিত প্রচারণার মাধ্যমে নিজেকে শক্ত প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ মাঠকর্ম তাঁর জন্য বড় প্লাস পয়েন্ট। ভোটারদের মতে, শেষ পর্যন্ত এই তিন প্রার্থীর মধ্যেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।
বিগত নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সিলেট-৫ আসনে বরাবরই আওয়ামী লীগের একটি বড় ভোট ব্যাংক রয়েছে। পাশাপাশি ইসলামী দলগুলোর প্রভাবও এখানে উল্লেখযোগ্য। ফলে আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে যে প্রার্থী আওয়ামী লীগের ভোট টানতে সক্ষম হবে, তিনিই বিজয়ের দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন; এমনটাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত।
১৯৯১ সালে ইসলামী ঐক্যজোটেরওবায়দুল হক, ১৯৯৬ আওয়ামী লীগের হাফিজ আহমেদ মজুমদার, ২০০১ সালে জামায়াতের ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের হাফিজ আহমেদ মজুমদার, ২০১৪ সালে জাতীয় পার্টির সেলিম উদ্দিন, ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের হাফিজ আহমেদ মজুমদার, ২০২৪ সালে আল ইসলাহর মোহাম্মদ হুছামুদ্দীন চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাফিজ আহমদ মজুমদার জয়ী হন। নৌকা প্রতীকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৩৫টি ভোট পান তিনি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ধানের শীষ প্রতীকে ৮৬ হাজার ১৫১ ভোট পান। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হাফিজ আহমেদ মজুমদার ১, হাজার ৬৯০ ও বিএনপি জামায়াতের জোটের প্রার্থী ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ৭৮ হাজার ৬১ ভোট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের উবায়দুল্লাহ ফারুক ৮ হাজার ৯৪৬ ভোট পান। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতের জোটের প্রার্থী ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ৭৭ হাজার ৭৫০ ভোট, আওয়ামী লীগের হাফিজ আহমেদ মজুমদার ৫২ হাজার ৮৮৫, ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এম. আর. হক ২৩ হাজার ৫৩৮ ভোট পান। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হাফিজ আহমেদ মজুমদার ২৯ হাজার ৪৮৩ জামায়াতের ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ২৮ হাজার ১২০, জাতীয় পার্টির মো. আব্দুল রাকিব ১৫ হাজার ০৫৪, সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের মো:হবিবুর রহমান ১৪ হাজার ৩৫৬, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের আলীম উদ্দিন ১৩ হাজার ৩২৫, ইসলামী ঐক্য জোটের ওবায়দুল হক ১০ হাজার ৪২৫ এবং বিএনপির প্রার্থী এম. এ. মতিন চৌধুরী মাত্র ৪ হাজার ৮৬০ ভোট পান।
এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২৮ হাজার ৭৪৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২১ হাজার ৩৫৭ এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৭ হাজার ৩৯১ জন। বিপুল এই ভোটারসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন বলে মনে করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা।
সব দিক বিবেচনায় বলা যায়, সিলেট-৫ আসনে এবারের নির্বাচন শুধুই দলীয় প্রতিযোগিতা নয়; এটি একটি ভোট ব্যাংক পুনর্বিন্যাসের লড়াই। কে কতটা আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যবাহী ভোট নিজেদের দিকে টানতে পারে, কে তরুণ ও ধর্মীয় ভোটারদের সংগঠিত করতে পারে; সেটিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে বিজয়ীকে। ফলে নির্বাচনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই আসনে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা বজায় থাকবে; এটাই এখন সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পূর্বাভাস।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
নিউজ ডেস্ক 








