জীবন রূপকথার রাজ্য নয়! জীবন মানেই যুদ্ধ। প্রত্যেক মানুষকেই তাঁর জীবন যুদ্ধের সাথে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়। এমনি এক জীবন সংগ্রামী নারী হলেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার মনরা বেগম। চার সন্তানের ওই জননীর বয়স ৫০। উপজেলা সদরের বাড়ি জগন্নাথপুর গ্রামের বাসিন্দা তিনি। সদরের পুরাতন সিলেটি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সড়কের পাশে এক কোনায় ভাঙা একটি চৌকিতে বসে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা রাত পর্যন্ত পিঠা বিক্রি করেন।
ওই পিঠা বিক্রির টাকায় চলে তাঁর সংসার। অভাবের সংসারে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া ঠিকমতো করাতে পারেন নি। তবে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন ওই পিঠা বিক্রির টাকায়। তবুও থেমে নেই জীবন সংগ্রামী ওই নারী। প্রতিবন্ধী এক ছেলেকে সাথে নিয়েই এখন তাঁর সংসার। পিঠা বিক্রেতা মনরা বেগমের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, গরীব ঘরে জন্ম তাঁর। ছোটবেলা থেকেই গরীব বাবার অভাবের সংসারে বেড়ে উঠেছেন। সেই সময় থেকেই অভাব অনটনের কারণে জীবনের কোন শখ—আহ্লাদ পূরণ করতে পারেননি। অভাবের সংসারে অল্প বয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় তাঁকে। বিয়েও হয় আরেক অভাবের সংসারে। তবে বেশ ভালোই চলছিল তাঁর সংসার। একে একে দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মা হন। কিন্তু কষ্ট যেন তাঁর পিছু ছাড়ছিল না। হঠাৎ করেই স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়।
মনরা বেগম বলেন, প্রায় ২৫ বছর আগে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। এরপর সংসারের হাল ধরতে পিঠা বিক্রি শুরু করি। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছি এবং এক ছেলেকে বিয়ে করিয়েছি। ছেলে বিয়ের পর আলাদা হয়ে গেছে। এখন প্রতিবন্ধী ছোট ছেলেকে নিয়েই আমার সংসার। ভিটামাটি কিছুই নেই। ২ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া বাড়িতে থাকছি। সরকারি ঘরের জন্য অনেকবার আবেদন করেও কোন ঘর পাইনি।
প্রতিবন্ধী ছেলেও জন্য পাইনি কোন সরকারি সুযোগ—সুবিধা। তিনি বলেন, ২৫ বছর ধরেই চালের গোড়ার তৈরি চিতই পিটা ও ভাপা পিঠা বিক্রি করে আসছি। আগে একটা পিঠা ৫ টাকায় বিক্রি করতাম এখন বিক্রি হয় ১০ টাকায়। চিতই পিঠার সাথে দিতে হয় আবার শুটকির চাটনি (ভর্তা)। প্রতিদিন খরচ বাদে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় হয়। তবে সারা বছরের তুলনায় শীতকালে আয় কিছুটা বাড়লেও বাড়ি ভাড়া, সংসারের খরচ ও ওষুধ কিনে মাস শেষে আর কিছুই থাকে না। নিজেস্ব মাথা গুঁজার ঠাঁই আর প্রতিবন্ধী ছেলের চিকিৎসার খরচ যোগাতে সরকারি সুযোগ সুবিধা পেলে; জীবনের শেষ সময়ে এসেও না হয় কিছুটা শান্তি পেতাম।
স্থানীয় ওয়ার্ডের সাবেক পৌর কাউন্সিলর শফিকুল হক বলেন, হার না মানা পরিশ্রমে করে বছরের পর বছর পিঠা বিক্রি করে সংসার জীবনে সফল এক মা মনরা বেগম।আসলে ইচ্ছাশক্তি থাকলে জীবনে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। মনরা তার প্রমাণ।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি 








