এবার ভালো ফলন হবে, এমন আশায় প্রহর গুনছিলেন কৃষক। কিন্তু বন্যার পানিতে সব ফসল নষ্ট হয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার পর দেখা দিয়েছে নতুন আতঙ্ক। মাঠের পর মাঠ ঢেকে গেছে বালুর স্তূপে। নিচু জমি উঁচু হয়ে গেছে। বালুর স্তূপ না সরালে জমিতে চাষাবাদ করা যে একেবারেই অসম্ভব।
এমন দুশ্চিন্তায় পড়েছেন মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় কৃষকেরা। সাম্প্রতিক ধলাই নদীর বন্যায় প্রতিরক্ষা বাঁধের ভাঙ্গনের ফলে ফসলি জমিতে বালু ও পলি মাটির স্তূপ জমেছে। এতে চাপা পড়েছে সেখানকার কৃষকের স্বপ্ন।
৬ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হলেও বীজ সহায়তা পেয়েছেন পেয়েছেন ১ হাজার কৃষক। যা চাহিদার তুলানায় অপ্রতুল। জমি চাষযোগ্য করে তুলতে তারা এখন সরকারি সাহায্য চান।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ৩৫ হাজার ১২৭ হেক্টর আউশ, ৮২ হাজার ৪৬৫ হেক্টর রোপা আমন, ৫ হাজার ১০৯ হেক্টর বিজতলা ও ৫৫০ হেক্টর জমিতে শাক সবজি আবাদ করা হয়েছে। এরমধ্যে বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে ৬৭২ হেক্টর আউশ জমি, ২৫ হাজার ৩৫৭ হেক্টর রোপা আমন, ১৫৬ হেক্টর বিজতলা ও ২৬৮ হেক্টর জমির শাকসবজি।
জানা গেছে, এবারের বন্যায় উপজেলার পতনঊষার, মুন্সিবাজার, আদমপুর, আলীনগর, শমসেরনগর এলাকার ফসলি জমির প্রায় ৩ হাজার হেক্টর আমন, ১ শত হেক্টর আউশ ফসল ও ১ হাজার হেক্টর সবজি খেত নষ্ট হয়ে গেছে। এতে উপজেলার ৬ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এছাড়াও কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ছাইয়াখালী হাওর, পতনঊষার ইউনিয়নের কেওলার হাওর এলাকা সবচেয়ে নিচু হওয়ায় ও বন্যার পানি স্থায়ী হওয়ায় সেখানকার কৃষকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সম্প্রতি এসব এলাকা ঘুরে ফসল ধ্বংসের কারণে মানুষের আহাজারি শোনা যায়।
ভূমিহীন কৃষক জয়নুল মিয়া জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন। ছয় জনের সংসার। পানির স্রোতে ঘর ভেসে গেছে, ধান খেত বালুতে হয়েছে নষ্ট। এখন বিভিন্ন এলাকা থেকে ত্রাণ নিয়ে আসা মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া তার আর কোনো কাজ নেই। এরকম আক্ষেপ সুর ও কান্নার কথা তার মুখে।
দক্ষিন গোলেরহাওড় গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ৬০ শতক জমিতে আমনের চাষ করি। কয়েকদিন আগেও ফসলের সবুজের ঢেউ মনে দোলা দিয়েছিল। কিন্তু এখন সব এলোমেলো হয়ে গেল। এবারের বন্যায় ফসলের মাঠ পানিতে নষ্ট হওয়ায় বাতাসে উৎকট গন্ধ। সবকিছু পানিতে শেষ হয়ে গেছে।
কোনাগাঁও গ্রামের কৃষক মো. শাহজাহান বলেন, আমার জমিতে এক ফসলি চাষ হয়। পানিতে সব নষ্ট করে দিয়েছে। এখন ঘরের মানুষের খাবারের ব্যবস্থার কথা চিন্তা হলে রাতে চোখে ঘুম আসেনা।
কৃষক কাদের মিয়া বলেন, এখন যদি বিনা পয়সায় সরকার বীজ, সার দিয়ে আমাদের সাহায্য করে, তাহলে এই মৌসুমেই আরেকবার চাষের চেষ্টা করতাম।
স্থানীয় কৃষকরা আরও জানান, আমনের চারা রোপণ করার কয়েকদিন পর থেকেই বন্যা শুরু হয়। ফসলি জমি বন্যার পানির নিচে থাকায় আমনের চারা ও সবজি পচে নষ্ট হয় গেছে। এখন বন্যার পানি কমলেও নতুন করে চাষ করার মতো সময় নেই। তাছাড়া সার, বীজ এবং শ্রমিকের মজুরি বাবদ যে অর্থ খরচ হবে সেটাও ব্যয়ভার বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি ভাবে সহযোগিতা না করলে ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব।
কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় জানান, বন্যায় উপজেলার সাড়ে ৬ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করা হয়েছে। কৃষকদের মাঝে দ্রুত সময়ে আমনের ৭৫ ও বীনা-১৭ জাতের বীজ সরবরাহ করা হবে।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক সামছুদ্দিন বলেন, চাষিদের বীজ প্রদানের জন্য তালিকা হচ্ছে। বীজ দিয়ে আবার আবাদ করলে হয়তো ক্ষতি কিছুটা কমবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে প্রণোদনা ও কৃষি উপকরণ দিয়ে সহায়তা করার চেষ্টা চালিয়ে যাবো আমরা।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি 








