তিন দশক পরও কেন অমলিন সালমান শাহ, ফিরে ফিরে আসে সেই স্বপ্নের নায়ক
রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১০ PM

তিন দশক পরও কেন অমলিন সালমান শাহ, ফিরে ফিরে আসে সেই স্বপ্নের নায়ক

বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬/০৯/২০২৬ ১০:১২:২৮ AM

তিন দশক পরও কেন অমলিন সালমান শাহ, ফিরে ফিরে আসে সেই স্বপ্নের নায়ক


একটি প্রজন্মের কাছে সালমান শাহ শুধু চলচ্চিত্রের নায়ক নন, তিনি নব্বইয়ের দশকের এক বিশেষ সময়ের প্রতীক। মৃত্যুর তিন দশক পূর্ণ হতে চললেও তাঁর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। বরং পুরোনো ছবি, গান, সংলাপ, পোশাক কিংবা অভিনয়ের দৃশ্য নতুন প্রজন্মের কাছে আবারও তাঁকে পরিচিত করে তুলছে।

‘বাবা বলে ছেলে নাম করবে, সারা পৃথিবী তাকে মনে রাখবে’ গানের এই পঙ্ক্তি যেন অদ্ভুতভাবে মিলে যায় সালমান শাহর জীবনের সঙ্গে। স্বল্প সময়ের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারেই তিনি এমন একটি অবস্থান তৈরি করেছিলেন, যা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁকে আলাদা করে রেখেছে। স্নিগ্ধ হাসি, সাবলীল অভিনয়, স্মার্ট উপস্থিতি এবং নিজস্ব ফ্যাশন সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন দর্শকের স্বপ্নের নায়ক।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। শুক্রবারের সেই দিনটি অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। কিন্তু বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দেশের মানুষের কাছে আসে এক অবিশ্বাস্য খবর। বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিকেল ৫টার সংবাদে জানানো হয়, জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ আর নেই।

খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পরই নেমে আসে শোক। মাত্র কয়েক বছরের ক্যারিয়ারে লাখো মানুষের ভালোবাসা পাওয়া এই তরুণ অভিনেতার আকস্মিক মৃত্যু ভক্তদের কাছে ছিল গভীর ধাক্কা। দেশীয় গণমাধ্যমের পাশাপাশি বিদেশের সংবাদমাধ্যমেও গুরুত্ব পায় তাঁর মৃত্যুর খবর।

সালমান শাহর চলে যাওয়ার পর ঢালিউডে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তার তাৎক্ষণিক কোনো বিকল্প পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে তাঁর জনপ্রিয়তার প্রভাব কাজে লাগিয়ে অনেক নায়ককে সালমানের আদলে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়। চুল, পোশাক ও আচরণে তাঁর ছাপ আনার চেষ্টা থাকলেও দর্শকের হৃদয়ে সালমানের জায়গা কেউ নিতে পারেননি।

কারণ, তিনি কেবল একজন চলচ্চিত্র অভিনেতা ছিলেন না। তাঁর উপস্থিতি একটি সময়ের সাংস্কৃতিক রুচি ও তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।

সালমান শাহর চলচ্চিত্রযাত্রার শুরু ১৯৯৩ সালে। সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমায় ইমন চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর। প্রথম সিনেমাতেই দর্শকের নজর কাড়েন এই তরুণ অভিনেতা। পরে ‘সালমান শাহ’ নামটিই হয়ে ওঠে তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ।

তবে বড় পর্দায় আসার আগেই বিনোদন জগতে তাঁর উপস্থিতি ছিল। আশির দশকের মাঝামাঝি হানিফ সংকেতের গ্রন্থনা ও উপস্থাপনায় প্রচারিত ‘কথার কথা’ অনুষ্ঠানের একটি মিউজিক ভিডিওতে অভিনয় করেন তিনি। ‘নামটি ছিল তার অপূর্ব’ গানের ভিডিওতে অপূর্ব চরিত্রে দেখা যায় তরুণ সালমানকে।

১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের দাড়িয়াপাড়ায় নানাবাড়িতে জন্ম সালমান শাহর। তাঁর বাবা কমরউদ্দিন আহমেদ ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট। মা নীলা চৌধুরী রাজনীতি ও সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে ছোটবেলা থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আলাদা আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।

সালমান শাহর প্রভাব শুধু সিনেমার পর্দায় সীমাবদ্ধ ছিল না। নব্বইয়ের দশকে তরুণদের ফ্যাশনেও তাঁর উপস্থিতি ছিল স্পষ্ট। ব্যাকব্রাশ চুল, মাথায় ব্যান্ডেনা, টি-শার্ট, জিন্স, বাহারি টুপি, কলারে রুমাল কিংবা হাতে ঘড়ি তাঁর ব্যবহৃত নানা অনুষঙ্গ দ্রুতই তরুণদের অনুসরণের বিষয় হয়ে ওঠে।

তখন রাস্তাঘাটে সালমানের মতো চুল কিংবা পোশাকে তরুণদের দেখা যেত। ফলে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি নিজেই একটি ফ্যাশন ট্রেন্ডে পরিণত হন।

তাঁকে ঘিরে ভক্তদের উন্মাদনার একটি ঘটনা ১৯৯৪ সালের। ‘তুমি আমার’ সিনেমার আউটডোর শুটিংয়ে কক্সবাজারে অবস্থানের সময় অটোগ্রাফ না পেয়ে এক তরুণী পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে আনন্দ বিচিত্রায় প্রকাশিত হয়েছিল। বিষয়টি জানতে পেরে সালমান দ্রুত ওই তরুণীকে নিবৃত্ত করেন এবং এমন কাজ না করার জন্য বোঝান।

এই ঘটনাটি তখনকার ভক্তদের মধ্যে তাঁকে ঘিরে থাকা আবেগের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচিত হয়েছিল। আর মৃত্যুর এত বছর পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর পুরোনো ছবি, ভিডিও, গান ও স্মৃতিচারণের উপস্থিতি দেখায়, সেই জনপ্রিয়তা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

তিন দশক পরও কেন সালমান শাহ?

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বহু জনপ্রিয় নায়ক এসেছেন। কিন্তু সালমান শাহর প্রভাবের ধরন ছিল আলাদা। তাঁর ক্যারিয়ার দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু সেই স্বল্প সময়ের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।

অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি পোশাক, চুলের স্টাইল, কথা বলার ধরন এবং পর্দায় নায়কের উপস্থাপনায় নিজস্ব একটি ধারা তৈরি করেছিলেন। তাঁর চরিত্রগুলোতেও ছিল বৈচিত্র্য কখনো রোমান্টিক তরুণ, কখনো বিদ্রোহী যুবক, আবার কখনো আবেগপ্রবণ প্রেমিক।

সময়ের সঙ্গে এসব চরিত্র পুরোনো হয়ে যাওয়ার বদলে নতুন দর্শকের কাছেও ফিরে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই ফিরে আসার পথ আরও সহজ করেছে। ফলে নব্বইয়ের দশকের সেই নায়ককে নতুন প্রজন্মও নিজেদের মতো করে আবিষ্কার করছে।

সালমান শাহর জনপ্রিয়তার সঙ্গে তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে থাকা রহস্য ও বিতর্কও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের সেই আকস্মিক মৃত্যুর পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে এটি আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল?

দীর্ঘ সময় ধরে এ নিয়ে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলেছে। সর্বশেষ গত ৯ আগস্ট সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় খলচরিত্রের অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন হককে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তাঁর ভাই আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে গত বছরের অক্টোবরে রাজধানীর রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, খল চরিত্রের অভিনেতা ডন হকসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে।

অন্য আসামিরা হলেন, সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ।

তিন দশক পরও তাই সালমান শাহকে ঘিরে আগ্রহের দুটি ধারা পাশাপাশি চলছে একদিকে তাঁর অভিনয়, স্টাইল ও স্মৃতিকে ঘিরে নতুন প্রজন্মের নস্টালজিয়া; অন্যদিকে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে পরিবারের দীর্ঘ আইনি লড়াই। সময় পেরিয়ে গেলেও দুটিই যেন তাঁকে দর্শকের আলোচনায় জীবন্ত রেখেছে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর