ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে হামলা দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়ানোর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর একাধিক হামলা চালিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে।
কুয়েত অভিযোগ করেছে, ইরান দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ (ডিস্যালিনেশন) প্ল্যান্টসহ গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। মরুপ্রধান কুয়েতে পানীয় জলের প্রায় ৯০ শতাংশই সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধ করে সরবরাহ করা হয়।
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে গিয়ে কুয়েত সাময়িকভাবে নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। দেশটি জানিয়েছে, ইরানি হামলায় সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে কাজ করার সময় কয়েকজন দমকলকর্মী ও একজন শ্রমিক আহত হয়েছেন।
শনিবার বাহরাইনও সম্ভাব্য ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় সাইরেন বাজিয়ে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে সতর্ক করে। অন্যদিকে জর্ডানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা পেত্রা জানিয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। এর আগে শুক্রবার জর্ডানে ইরানের হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে দুই মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলে শনিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর ইরানের এই হামলা এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলার জবাবে।
শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা অব্যাহত রাখলে তাদের ‘অবিস্মরণীয় শিক্ষা’ দেওয়া হবে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জনসমক্ষে না আসা খামেনির নামে দেওয়া এই বার্তা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে পাঠ করে শোনানো হয়।
এদিকে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) মহাসচিব কুয়েতে ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো যুদ্ধাপরাধের শামিল।
জিসিসির মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আল-বুদাইউই এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইরানের কর্মকাণ্ড অত্যন্ত বিপজ্জনক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এটি আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘনের পাশাপাশি বেসামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করায় যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়ে। এর জন্য আন্তর্জাতিক জবাবদিহি ও বিচার হওয়া উচিত।’
খবরে বলা হয়েছে, ইরান কুয়েতের একটি তেল স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছে। এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন।
কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা বেসামরিক অবকাঠামোকে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার শত্রুতাপূর্ণ মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ, যা সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।’
শুক্রবার গভীর রাতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রতারণামূলক গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশনায়’ চলা দুটি তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালীতে মাইনে আঘাত করে বিস্ফোরিত হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
আইআরজিসি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে আরও দাবি করে, তারা হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করা চারটি জাহাজ থামিয়ে দিয়েছে। এছাড়া শনিবার ভোরে জর্ডানের আজরাকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত দুটি মার্কিন যুদ্ধবিমান এবং আরও তিনটি উড়োজাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা কেন্দ্র এবং আলি আল সালেম বিমানঘাঁটির একটি মার্কিন রাডার স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও জানিয়েছে, বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধবিমান এবং একটি গোয়েন্দা তথ্যকেন্দ্রও আইআরজিসির লক্ষ্যবস্তু ছিল।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, টানা সপ্তম রাতের মতো শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা (গ্রিনিচ সময়) থেকে শুরু হওয়া তাদের হামলার উদ্দেশ্য ছিল ‘ইরানের সামরিক সক্ষমতা আরও দুর্বল করা’।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, রাতভর হামলায় তারা ইরানের নজরদারি কেন্দ্র, সামরিক রসদ অবকাঠামো, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভান্ডার এবং নৌ-সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছে, সিরিক, আহভাজ ও ইয়াজদ শহরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে অথবা সেখানে হামলা হয়েছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে সংঘাত শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
শুক্রবার প্রথমবারের মতো ইরান স্বীকার করে যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় সফল হামলা চালিয়েছে। এরপর দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দাদের বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানায়। সেখানে তীব্র তাপপ্রবাহ চলছে। তবে কোন স্থাপনায় হামলা হয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়নি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আরও দুই থেকে তিন দিন হামলা চালালে তেহরান ‘পূর্ণমাত্রার আক্রমণাত্মক অভিযান’ শুরু করবে।
‘ইরান আর হামলার জবাবে শুধু সমপর্যায়ের পাল্টা হামলায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। এরপর কোনো দেশ বা সীমান্তই নিরাপদ থাকবে না,’ ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরআইবির বরাত দিয়ে এ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মোহসেন রেজায়ী।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 








