স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে চান আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ১১:২১ AM

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে চান আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭/০৭/২০২৬ ০৮:৪৯:২৭ AM

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে চান আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা


আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী। নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে হলে তাদের অংশ নিতে আইনি বাধা থাকবে না বলে মনে করছেন তারা। একই সঙ্গে এই নির্বাচনের মাধ্যমে মাঠের রাজনীতিতে ফেরার একটি সুযোগও তৈরি হতে পারে বলে তাদের ধারণা।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হলে দলটির তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী নির্বাচনে অংশ নেবেন। এ লক্ষ্যে অনেকেই এখন থেকেই প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা শুরু করেছেন। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে তাদের আগ্রহ বেশি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেই অংশ নেওয়া তাদের জন্য তুলনামূলক সহজ হবে বলে তারা মনে করছেন।

দলটির নেতাকর্মীরা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনার খবর পাওয়ার পর থেকেই অনেকের মধ্যে আগ্রহ বেড়েছে। তাদের ধারণা, নির্দলীয় নির্বাচনে সরকার সরাসরি কাউকে অংশগ্রহণে বাধা দিতে পারবে না। সরকার-সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন বক্তব্য থেকেও এ ধরনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে বলে তারা মনে করছেন। এ কারণে এই নির্বাচনকে তারা রাজনীতিতে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার এবং নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

আগামীতে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো নির্দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে নির্বাচন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনও (ইসি) প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনও দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হওয়ার বিধান চালু করা হয়েছিল। তবে বর্তমান বিএনপি সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো আবার নির্দলীয়ভাবে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রার্থীদের দলীয় পরিচয় বা দলীয় প্রতীক থাকবে না। ফলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি কোনো জটিলতা বা প্রতিবন্ধকতা থাকছে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য থেকেও এমন ইঙ্গিত মিলছে। নির্ধারিত যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করতে পারলে যে কেউ প্রার্থী হতে পারবেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

গত ২১ জুন নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমি নির্বাচনের প্রার্থীকে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনি। প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়টা আমার কাছে গৌণ। যেহেতু স্থানীয় নির্বাচন দলীয় নয়, দলীয় অঙ্গীকারনামাও নেই। প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতা আইনেই নির্ধারিত। সেই শর্ত পূরণ করলে তিনি প্রার্থী হতে পারবেন, না করলে পারবেন না। বিষয়টি খুবই স্পষ্ট।’

এর আগে গত ৯ জুন সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, নির্বাচনের নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে পারলে যে কোনো ব্যক্তি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।

তিনি বলেন, ‘এটি নির্দলীয় নির্বাচন। এখানে কেউ দলের পরিচয়ে অংশ নেবেন না। ব্যক্তি হিসেবে যিনি নির্ধারিত শর্ত পূরণ করবেন, তিনি চাইলে নির্বাচন করতে পারবেন।’

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা রয়েছে। বিষয়টি জাতীয় সংসদেও উত্থাপিত হয়েছে। গত ১৫ জুন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ সেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কি না। তিনি বলেন, এ বিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য আসছে। বিষয়টি পরিষ্কার হলে সবার বুঝতে সুবিধা হতো।

জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন যথাসময়েই অনুষ্ঠিত হবে। তবে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যাপারে আমি আশ্বস্ত করতে পারি যে, যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং যে সিদ্ধান্তে আমরা একমত হয়েছি, সে অনুযায়ী নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে।’

পরদিন ১৬ জুন সংসদে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী জানান, চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমের পর সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আগ্রহ থাকলেও এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে দলটির একটি সূত্র জানায়, নির্দলীয় নির্বাচন হলে নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সেটি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। যেহেতু নির্বাচনটি নির্দলীয়, তাই দলীয়ভাবে এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার প্রয়োজনও নেই। তবে নির্বাচন থেকে বিরত থাকার কোনো সিদ্ধান্ত হলে তা অবশ্যই দল থেকে জানিয়ে দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে নেতাকর্মীরাও দলের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করবেন।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় পর্যায়ের কোনো নির্বাচন কিংবা পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা থাকবে না। বরং সুযোগ থাকলে নেতাকর্মীদের এসব নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে অঘোষিতভাবে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়েও নেতাকর্মীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা ও সাবেক মন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কোনো নির্বাচনেই অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না। অনেক জায়গায় বাধা দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগ-সমর্থিত পেশাজীবীরা কোথাও কোথাও নির্বাচন করতে চাইলেও অংশ নিতে পারেননি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে দল থেকে মৌখিকভাবে বলা আছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বাধা না থাকলে দলের অনেকেই অংশ নেবেন।’

গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ওই দিনই শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। দলের নেতাকর্মীরাও আত্মগোপনে চলে যান। দলের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা, সাবেক মন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের অনেকে দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যান।

এরপর গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধনও স্থগিত করে। ফলে গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি।

পরবর্তীতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধসংক্রান্ত অধ্যাদেশটি গত ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বিল আকারে পাস করে আইনে পরিণত করা হয়। এর ফলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর