প্রায় তিন বছর ধরে সমাজচ্যুত ৩০ পরিবার
রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৪ AM

প্রায় তিন বছর ধরে সমাজচ্যুত ৩০ পরিবার

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৬/১২/২০২৪ ১১:১৪:৩১ AM

প্রায় তিন বছর ধরে সমাজচ্যুত ৩০ পরিবার


গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাবেক সংসদ সদস্য আবু জাহিরের নির্দেশে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লুকড়া গ্রামে ৩০টি পরিবারকে সমাজচ্যুত করা হয়েছিল। বর্তমানে আবু জাহির আত্মগোপনে থাকলেও তার সেই নির্দেশে গত প্রায় ৩ বছর ধরে সমাজচ্যুত অবস্থায় আছে ওই গ্রামের নিরীহ ৩০টি পরিবার।

জানা গেছে, সমাজচ্যুত ৩০টি পরিবারের লোকজনের সাথে অন্য কেউ কথা বললে করা হয় ২০ হাজার টাকা জরিমানা। হাওডরে কৃষিজমি চাষাবাদে দেওয়া হয় না পানি, বাজার বা দোকানে তাদের কাছে বিক্রি করা হয় না পণ্য। ফলে দীর্ঘদিন ধরে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এছাড়া ওই ৩০টি পরিবারের লোকজনের বাড়ি থেকে জেলা শহরে যাওয়ার একমাত্র এলজিইডির তালিকাভুক্ত রাস্তাটির ইট সলিং তুলে নিয়ে মাটিও কেটে নেওয়া হয়েছে। সবই করা হচ্ছে তাদেরকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। অন্যদিকে ভুক্তভোগীদের বাড়িঘর ভেঙে নিরীহ ৩০টি পরিবারের মালিকানাধীন জমির উপর দিয়ে নিজেদের আধিপত্য দেখানোর জন্য নতুন করে আরেকটি রাস্তা নির্মাণ করেছেন গ্রামের কথিত মোড়লরা।

ঘটনার পর থেকেই ভুক্তভোগীরা একাধিকবার প্রশাসনের শরণাপন্ন হয়েছেন। কিন্তু সাবেক এমপি আবু জাহিরের নির্দেশে সমাজচ্যুত করার কারণে ব্যবস্থা নিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে একাধিকবার স্থানীয় এবং জাতীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। এরপরও কর্তৃপক্ষ কার্যকরী কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় বাধ্য হয়ে ভুক্তভোগী মো. জালাল উদ্দিন গং আবারও গত ২২ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জের বর্তমান জেলা প্রশাসক ড. মো. ফরিদুর রহমানের কছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

এর প্রেক্ষিতে কোর্ট স্টেশন পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. মফিজুল উদ্দিন খানকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিতের জন্য তদন্তের নির্দেশ প্রদান করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ১৫ নভেম্বর অভিযোগের প্রায় শতভাগ সত্যতা পেয়েছেন বলে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন মো. মফিজুল উদ্দিন খান।

তদন্ত প্রতিবেদনে শতভাগ সত্যতা পাওয়ার পরেও কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না তা জানতে জেলা প্রশাসক ড. মো. ফরিদুর রহমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

কোর্ট স্টেশন পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. মফিজুল উদ্দিন খান প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ওই গ্রামের মো. জালাল উদ্দিন গংদের সাথে একই গ্রামের মো. আকবর হোসেন বাচ্চুর ছেলে আব্দুস শহিদ, মৃত হাজী এরশাদউল্লাহ ছেলে মো. ওয়াহিদ মিয়া, মো. মর্তুজ আলীর ছেলে মো. রহমান, মৃত আতাব উল্লাহর ছেলে মো. সাহেদ আলী, মৃত সৈয়দ আলীর ছেলে মো. জোয়াদ আলী, মো. আব্দুল সহিদ, মো. ওয়াহেদ মিয়া (সাবেক মেম্বার), রফিকুল ইসলাম (সাবেক মেম্বার) গং নেতৃত্ব প্রদান করে এবং তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির এর আস্থাভাজন হওয়ায় এবং বংশগতভাবে ও জনবলে শক্তিশালী হওয়ায় তারা গ্রাম্য পঞ্চায়েতের নামে নেতৃত্ব দিয়ে পুরো গ্রামবাসীকে তাদের নিকট জিম্মি রাখে। তাদের উপরে কেউ কথা বলার সাহস পায় না। তারা যা বলে পুরো গ্রামবাসী তা মানতে বাধ্য থাকে। তাদের ইশারা ও মদদে উপরে উল্লেখিত ব্যক্তিরাসহ একদল লোক সংঘবদ্ধভাবে সরকারি রাস্তা বাদ দিয়ে ভুক্তভোগীদের বারি সংলগ্ন পূর্বদিকের জায়গাটি সরকারি খাস জায়গা দাবি করে সেই জায়গার উপর দিয়ে নতুন করে রাস্তা নেওয়ার চেষ্টা করে। এসময় ভুক্তভোগীরা বাধা প্রদান করেন। উক্ত রাস্তার বিষয় নিয়ে ৩০টি পরিবারের লোকজনের সাথে দুষ্কৃতিকারীদের বিরোধ দেখা দিলে অত্র এলাকার "বার পঞ্চায়েত কমিটির" সভাপতি মো. রইস মিয়ার (সাবেক চেয়ারম্যান) তত্ত্বাবধানে শালিস বৈঠক হয়। উক্ত বৈঠকে দুষ্কৃতিকারী প্রভাবশালীদের দাবিকৃত জায়গাটি বাদীপক্ষের নিজস্ব জায়গা বলে প্রমাণিত হয়। পরে প্রভাবশালীরা উক্ত সালিশ বৈঠকের সিদ্ধান্ত অমান্য করে তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহিরের তত্ত্বাবধানে সরকারি রাস্তার মাটি কেটে ফেলে এবং বাদীপক্ষের নিজস্ব জায়গার উপর নির্মিত বসতঘর, টয়লেট, টিউবওয়েল, দোকানঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করে ও গাছপালা কেটে ফেলে। তারা জনগণের চলাচলের জন্য একটি সরকারি রাস্তা থাকা সত্বেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আরেকটি নতুন রাস্তা নির্মাণ করে। পরে বাধ্য হয়ে ভুক্তভোগীরা গ্রামের প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ হবিগঞ্জ আদালতে বহু মোকদ্দমা নং- ১৪৯/২০২২, ১৫৬/২০২২, ৮৫/২০২৩, ৪৩/২০২৪ দায়ের করেন। বর্তমানে ওই মামলা বিজ্ঞ আদালতে চলমান। একই সাথে ভুক্তভোগীরা হাইকোর্টে রিট পিটিশন নং- ১০৩৯৩/২০২৩ দাখিল করেন। উক্ত রিটপিটিশনে বিরোধীয় জায়গার ওপর মামলা চলমান থাকাবস্থায় স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার আদেশ প্রদানের অনুরোধ করেন।

জানা গেছে, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওই ৩০টি পরিবারকে সমাজচ্যুত করা হয়। এ সময় তারা গ্রাম্য পঞ্চায়েতে ঘোষণা করেন, লুকড়া গ্রামের কোনো মানুষ তাদের সাথে কোনো প্রকার লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, পারিবারিক বা সামাজিক যোগাযোগ রাখতে পারবেন না। কেউ কোনো প্রকার যোগাযোগ করলে তাদেরকে বিচারের আওতায় আনার ঘোষণা প্রদান করা হয়। এরপর থেকে ওই ৩০টি পরিবারের সাথে পঞ্চায়েতের ভয়ে গ্রামের সাধারণ লোকজন যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।

এর পর থেকে নিরীহ ৩০টি পরিবারের লোকজনের কাছে লুকড়া গ্রামের কোনো ব্যবসায়ী পণ্য বিক্রি করেন না। ধানের মৌসুমে সরকারি পানির স্কিম পরিচালক প্রভাবশালীদের ভয়ে জমিতে সেচের জন্য পানি দেন না। এতে করে জমিতে চাষাবাদ করতে পারেন না ভুক্তভোগীরা।

আজকের সিলেট/প্রতিনিধি/এপি

সিলেটজুড়ে


মহানগর