বিষমুক্ত খেলনার চাহিদা বাড়ছে, রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনা
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৪ PM

বিষমুক্ত খেলনার চাহিদা বাড়ছে, রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনা

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯/০৭/২০২৬ ১১:১৪:০৮ AM

বিষমুক্ত খেলনার চাহিদা বাড়ছে, রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনা


একটি শিশুর হাতে থাকা খেলনা শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়; এটি শেখা, কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা ও মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী। একটি রঙিন ব্লক, কাঠের ট্রেন বা কাপড়ের পুতুল শিশুর জ্ঞান, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে। কিন্তু সেই খেলনায় যদি সীসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ, ফ্যাথালেট বা বিসফেনল-এ (বিপিএ)-এর মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে, তবে তা শিশুর শরীরে নীরবে বিষক্রিয়া ছড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষাক্ত খেলনার সংস্পর্শে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হওয়া, স্মৃতিশক্তি ও শেখার সক্ষমতা কমে যাওয়া, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, শ্বাসকষ্ট, ত্বকের সমস্যা এবং কিডনি-লিভারের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়। শিশুদের খেলনা মুখে নেওয়া ও চিবানোর অভ্যাস থাকায় এসব রাসায়নিক সহজেই তাদের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

বিশ্বজুড়ে খেলনার নিরাপত্তা এখন জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক খেলনা বাজার প্রায় ১২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে কম দামের পাশাপাশি নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন খেলনার চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে।

বাংলাদেশেও খেলনার বাজার সম্প্রসারিত হলেও নিম্নমানের ও ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত খেলনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নিরাপদ ও মানসম্মত খেলনা উৎপাদনের বিকল্প নেই। সরকার ইতোমধ্যে খেলনার জন্য বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা মান নির্ধারণ করেছে, যা শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি রপ্তানি সম্ভাবনাও বাড়াবে।

নীরব ঝুঁকির নাম বিষাক্ত খেলনা
অনিরাপদ খেলনার ক্ষতিকর প্রভাব অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে সীসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ ও ফ্যাথালেটসের মতো রাসায়নিক শিশুর শরীরে জমে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এসব উপাদান খেলনার রং, প্লাস্টিক বা অন্যান্য অংশে ব্যবহৃত হয় এবং খেলনা মুখে নেওয়ার কারণে সহজেই শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের মতে, অল্প পরিমাণ সীসাও শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে শেখার সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি ও আচরণগত জটিলতা দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, ফ্যাথালেটস হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাতে পারে, আর ক্যাডমিয়াম ও পারদের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ কিডনি, হাড় ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়। তাদের মতে, নিরাপদ খেলনা নিশ্চিত করা শুধু উৎপাদক নয়, সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও অভিভাবকদেরও যৌথ দায়িত্ব। খেলনা কেনার সময় নিরাপত্তা সনদ, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং ব্যবহৃত উপকরণ সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।

এ বিষয়ে লেখক ও প্যারেন্টিং এক্সপার্ট এবং কিডস টাইমের প্রতিষ্ঠাতা তাহমিনা রহমান বাংলানিউজকে বলেন, ‘জীবনের প্রথম পাঁচ বছর শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক ও শারীরিক বিকাশ ঘটে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে। এই সময়ে খেলনা কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ নয়, বরং তা শিশুর শেখা, চারপাশকে অন্বেষণ করা এবং তার সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশের এক অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তাই শিশুদের প্রতিটি খেলনা নিরাপদ ও মানসম্মত হওয়া অপরিহার্য। সিসা কিংবা ফথ্যালেটসের মতো ক্ষতিকর প্লাস্টিসাইজার (যা প্লাস্টিক নরম করতে ব্যবহৃত হয়) মুক্ত কাঁচামাল নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ এবং কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ পরীক্ষার পরেই খেলনা বাজারজাত করা উচিত। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ ও নিরাপদ বিকাশের স্বার্থে এটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।’

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা যা শিক্ষা দেয়
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খেলনার নিরাপত্তাকে জনস্বাস্থ্য ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হয়। গত দুই দশকে বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত খেলনা নিয়ে একাধিক ঘটনার পর বিভিন্ন দেশ নিরাপত্তা আইন আরও কঠোর করেছে।

২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সীসাযুক্ত রং ব্যবহারের কারণে লক্ষাধিক খেলনা বাজার থেকে প্রত্যাহার করা হয়। এ ঘটনার পর শিশুদের পণ্যে সীসাসহ ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, বাধ্যতামূলক মান পরীক্ষা এবং উৎপাদক-আমদানিকারকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাজার তদারকিতে নরম প্লাস্টিকের খেলনায় অতিরিক্ত ফ্যাথালেট শনাক্ত হওয়ার পর বহু খেলনা প্রত্যাহার করে। বর্তমানে ইউরোপে খেলনা বাজারজাতের আগে রাসায়নিক ও যান্ত্রিক নিরাপত্তাসহ নির্ধারিত মান পূরণ বাধ্যতামূলক এবং নিয়মিত বাজার নজরদারি চালানো হয়।

চীন থেকে রপ্তানি হওয়া কিছু খেলনায় ক্যাডমিয়াম শনাক্ত হওয়ার পর উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে সেগুলো আমদানি ও বিক্রি বন্ধ করা হয়। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল থেকে চূড়ান্ত পণ্য পর্যন্ত মান নিয়ন্ত্রণ ও রাসায়নিক পরীক্ষার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

জাপান, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশেও খেলনা বাজারজাতের আগে স্বীকৃত পরীক্ষাগারে মান যাচাই, নিরাপত্তা সনদ এবং নিয়মিত তদারকি বাধ্যতামূলক। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, খেলনার নিরাপত্তা এখন শুধু স্বাস্থ্য নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেরও অন্যতম শর্ত।

বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশে খেলনা শিল্প দ্রুত বিকাশমান। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের খেলনা বাজারের আকার প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার খেলনা দেশেই উৎপাদিত হয়, আর প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার খেলনা আমদানি করা হয়।

বর্তমানে শতাধিক প্রতিষ্ঠান প্লাস্টিক, কাঠ, কাপড় ও শিক্ষামূলক খেলনা উৎপাদন করছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে খেলনা রপ্তানি শুরু করেছে। তবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরীক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও মান সনদের উচ্চ ব্যয় এখনো এ শিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ।

২০২৪ সালে বাংলাদেশের খেলনা আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস ছিল চীন। শুধু একটি শ্রেণিতেই প্রায় ৩১.৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের খেলনা আমদানি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি যেমন উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়, তেমনি দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বাজার-সুযোগও তৈরি করে। এছাড়াও নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন খেলনা উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। এজন্য নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করা, আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার স্থাপন, দক্ষ জনবল এবং কার্যকর সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় জরুরি।

বাংলাদেশ টয় মার্চেন্টস, ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সেফায়াত উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের খেলনা শিল্প এখন শুধু দেশের বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও এর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব খেলনা উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নিরাপদ কাঁচামাল ব্যবহার, ক্ষতিকর রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত মান পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে উৎপাদক, আমদানিকারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও পরীক্ষাগারগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান মেনে খেলনা উৎপাদন করতে পারলে একদিকে শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের খেলনা শিল্পের প্রতি বৈশ্বিক ক্রেতাদের আস্থা বাড়বে এবং রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হবে।

নিরাপত্তা মান বাধ্যতামূলক
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো শিশুদের খেলনার জন্য বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা মান (বিডিএস) কার্যকর করেছে সরকার। শিল্প মন্ত্রণালয়ের ২৩ জুনের প্রজ্ঞাপনের পর ২৭ জুন থেকে নির্ধারিত মান পূরণ ছাড়া কোনো খেলনা উৎপাদন, আমদানি বা বাজারজাত করা নিষিদ্ধ। এ মান বাস্তবায়ন ও তদারকির দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এতদিন বাধ্যতামূলক মান না থাকায় বাজারে নিম্নমানের ও বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত খেলনার ঝুঁকি ছিল। নতুন ব্যবস্থায় দেশীয় ও আমদানি করা সব খেলনাকেই বাজারজাতের আগে নির্ধারিত নিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে ইএসডিও ও বিএএন টক্সিকসের যৌথ গবেষণায় ঢাকার বাজার থেকে সংগ্রহ করা ১৫০টি শিশু পণ্যের ৮০ শতাংশে সীসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু পাওয়া যায়। একই গবেষণায় দেখা যায়, ৮৮ শতাংশ অভিভাবক খেলনায় বিষাক্ত উপাদানের ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত নন।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে শতাধিক প্রতিষ্ঠান খেলনা উৎপাদন করছে এবং বাংলাদেশ ৪৭টি দেশে খেলনা রপ্তানি করছে। নিরাপত্তা মান কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। তবে এর জন্য পরীক্ষাগার স্থাপন, কারিগরি সহায়তা ও উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিশ্চিত করাও জরুরি।

জাতিসংঘ শিল্প উন্নয়ন সংস্থার (ইউনিডো) রিসাইক্লিং ও পরিবেশবান্ধব ডিজাইন বিশেষজ্ঞ মাহবুল ইসলাম বলেন, ‘একটি নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব খেলনা শুধু শিশুর আনন্দের উপকরণ নয়, এটি তার সুস্থ শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই খেলনা উৎপাদনে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। এই মান নিশ্চিত করবে যে খেলনায় এমন কোনো উপাদান বা নকশাগত ত্রুটি থাকবে না, যা শিশুদের শ্বাসরোধ, বিষক্রিয়া, অগ্নিঝুঁকি বা শারীরিক আঘাতের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে সীসা, ফথালেটস, ভারী ধাতুসহ অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ কাঁচামাল ব্যবহার এবং স্বীকৃত পরীক্ষাগারে মান যাচাইয়ের মাধ্যমে খেলনা বাজারজাত করা প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের খেলনা শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক ও রপ্তানিযোগ্য খাত হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পাবে।’

নিরাপদ খেলনা উৎপাদনে ‘গুফি’
দেশে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব খেলনা তৈরিতে কাজ করছে এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি ‘গুফি’। এটি লাইট অব হোপের টয় ও লার্নিং প্রোডাক্ট ব্র্যান্ড। ২০১৯ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি বাঁশ, কাঠ ও কাপড়ের মতো প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে প্রায় ১৫ ধরনের খেলনা তৈরি করছে। এসব খেলনা শিশুর সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে সহায়ক হিসেবে নকশা করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, রাসায়নিকমুক্ত উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে তারা একদিকে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে কাজ করছে, অন্যদিকে প্লাস্টিকনির্ভর খেলনার বিকল্প তৈরি করছে। স্থানীয় কারিগর ও দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে একটি টেকসই উৎপাদন মডেল গড়ে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলনা শিল্পের একটি বড় সম্ভাবনা হলো গ্রামীণ পর্যায়েও উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তোলা। এতে স্থানীয় কারিগর, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও নারীদের কর্মসংস্থান বাড়বে। গুফির ‘ইকো টয় ভিলেজ’ নামে একটি উদ্যোগ রয়েছে, যার মাধ্যমে এই শিল্প একইসঙ্গে কর্মসংস্থান, নারী ক্ষমতায়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্ববাজারে বাড়ছে পরিবেশবান্ধব খেলনার চাহিদা
জলবায়ু পরিবর্তন ও প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব ও রাসায়নিকমুক্ত খেলনার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কাঠ, বাঁশ, তুলা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপকরণে তৈরি খেলনার পাশাপাশি শিক্ষামূলক ও মন্টেসরি খেলনার বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক কাঁচামাল, দক্ষ কারিগর ও তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়ের কারণে এ খাতে বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সনদ নিশ্চিত করা গেলে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াসহ উন্নত বাজারে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তাদের মতে, নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও উদ্ভাবনী নকশায় বিনিয়োগই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের খেলনা শিল্পকে নতুন রপ্তানি খাতে পরিণত করতে পারে।

গুফির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়ালিউল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, ‘একটি খেলনা শুধু আনন্দের নয়, শিশুর চিন্তা, কল্পনা ও শেখারও মাধ্যম। তাই খেলনা নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও শিক্ষামূলক হওয়া জরুরি। বাংলাদেশের দক্ষ কারিগর, প্রাকৃতিক কাঁচামাল ও সৃজনশীল উদ্যোক্তাদের কাজে লাগাতে পারলে দেশ বৈশ্বিক বাজারে নিরাপদ খেলনার নির্ভরযোগ্য উৎস হতে পারে।’

তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে এখন শুধু দামের নয়, পণ্যের নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও সামাজিক দায়বদ্ধতারও গুরুত্ব বাড়ছে। এসব মান নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের খেলনা শিল্প বড় রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে।

রপ্তানি বাড়াতে যা করতে হবে
বাংলাদেশের খেলনা শিল্প ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও এর সম্ভাবনা বাড়ছে। তবে এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নিরাপত্তা মান নির্ধারণ করলেই হবে না, তা কঠোরভাবে বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কার্যকর মান নিয়ন্ত্রণ না থাকলে অনিরাপদ খেলনা বাজারে আসবে, যা শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করবে।

তারা বলছেন, রপ্তানি বাড়াতে আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার স্থাপন, বিএসটিআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দেশেই আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পরীক্ষা ও সনদ প্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য নিরাপত্তা মান, আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতি ও পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সনদ অর্জনের ব্যয় ও জটিলতা কমাতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, সহজ শর্তে ঋণ, কর-সুবিধা ও প্রণোদনা খেলনা শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে বলে মত তাদের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে বাণিজ্য মেলা, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী, অনলাইন বিপণন ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ খেলনার ব্র্যান্ডিং জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়িয়ে শিক্ষামূলক, উদ্ভাবনী ও নিরাপদ খেলনা তৈরি এবং নকল ও নিম্নমানের খেলনার বিরুদ্ধে কঠোর বাজার তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

জানতে চাইলে ওয়ালিউল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান মেনে পরিবেশবান্ধব, শিক্ষামূলক ও মানসম্পন্ন খেলনা উৎপাদনে গুরুত্ব দেয়, তাহলে দেশের শিশুরা নিরাপদ খেলনা ব্যবহারের সুযোগ পাবে। একইসঙ্গে বিশ্ববাজারে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ পরিচয়ের সঙ্গে যদি যুক্ত হয় ‘নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন খেলনা’, তবে এটি দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। নিরাপদ খেলনা নিশ্চিত করা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার সমন্বিত উদ্যোগই বাংলাদেশের খেলনা শিল্পকে বৈশ্বিক বাজারে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, পরিকল্পিত নীতি, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের খেলনা শিল্প দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর