রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কৌশলে কাছে টানার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি বিএনপি ও এনসিপি নেতাদের বক্তব্য থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ বা দলটির ভাতৃপ্রতিম সংগঠনের অভিযুক্ত নন এমন নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ব্যাপারে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ অধ্যাদেশ আইন করে বহাল রাখায় এই সুযোগ নিতে চাচ্ছে বিএনপি ও এনসিপি। আর এ ধরনের সুযোগ এলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দলটির কিছু নেতাকর্মী বিভিন্ন কারণে সে সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন, এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে।
গত ১৯ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, এনসিপিতে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কার কী সাবেক পরিচয়, তা আমাদের কাছে মুখ্য নয়। কে আগে কোন রাজনৈতিক দল বা সংগঠন করেছে—ছাত্রদল হোক, ছাত্রশিবির হোক, ছাত্র অধিকার পরিষদ এমনকি ছাত্রলীগ হোক; সাবেক পরিচয় আমাদের কাছে মুখ্য নয়। তবে কোনো ফ্যাসিবাদে অংশগ্রহণকারী, গণহত্যায় অংশগ্রহণকারী, গণহত্যাকে সমর্থনকারী, চাঁদাবাজ বা দুর্নীতিতে অভিযুক্ত ব্যক্তি এনসিপিতে আসতে পারবে না।
এনসিপি নেতার ওই বক্তব্যের মাধ্যমে সেই সম্ভাবনাটি অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে যে, রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের তুলনামূলক স্বচ্ছ নেতাকর্মীরা এনসিপিতে আসতে চাইলে তাদের দলে নেওয়া হতে পারে। এনসিপি একটি নতুন রাজনৈতিক দল। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, নতুন কোনো রাজনৈতিক দলের উত্থানের সময় সেটিকে শক্তিশালী করতে পুরোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের টানা হয়। কারও কারও ধারণা, নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এনসিপি একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে বিভিন্ন দল থেকে নেতাকর্মী টানার কৌশল নিতে পারে। এর মাধ্যমে দলটি রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়। এ ক্ষেত্রে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের টার্গেট করা হতে পারে।
অন্যদিকে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। দলটির একাধিক নেতা বলেছেন, আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মীকে এক কাতারে ফেলা উচিত নয়। যারা দুর্নীতি, লুটপাট বা স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেননি, তাদের প্রতি সহনশীল হওয়া উচিত। বিএনপির কোনো কোনো নেতা বলেছেন, আওয়ামী লীগের যারা দুর্নীতি, লুটপাট, অত্যাচার-নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তারা এসবের জন্য দায়ী নন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি অঘোষিত বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনের সময় বিএনপির প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভোট নিজেদের দিকে টানতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছেন। রাজনৈতিক মহলে এমন আলোচনা রয়েছে যে, আওয়ামী লীগের অনেক ভোটার বিএনপির প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের ওই স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্য থেকে অনেককে বিএনপি কাছে টানার চেষ্টা করতে পারে।
ওই দুই দলের বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী আছেন, যারা লুটপাট, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে দূরে ছিলেন। তারা স্বচ্ছ রাজনীতি করেছেন। গত ১৬ বছরে যারা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন, খুন-হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রেখে চলার চেষ্টা করেছেন—আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের এমন নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে বিএনপি ও এনসিপির মনোভাব তুলনামূলক ইতিবাচক। আওয়ামী লীগের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাকর্মীরা স্বেচ্ছায় এলে তাদের গ্রহণে এ দুই দল আপত্তি দেখছে না।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপনে চলে যান। আত্মগোপনে থাকা কেউ কেউ স্থানীয়ভাবে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নিজেদের নিরাপদ রাখার চেষ্টা করেছেন। বিএনপির নেতাকর্মীরাও অনেক ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা দিয়েছেন, যাতে তারা কোনো সমস্যায় না পড়েন। আবার কেউ কেউ বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলছেন এবং বিএনপির পক্ষ থেকেও তাদের প্রতি কোনো বাধা দেওয়া হচ্ছে না।
এছাড়া আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী বর্তমানে নানা সমস্যার মধ্যে রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে তাদের অন্য দলে ভেড়ানো তুলনামূলক সহজ হতে পারে। বিএনপির স্থানীয় নেতারাও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে দল ভারী করার জন্য অন্য দলের নেতাকর্মীদের টানার চেষ্টা করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ওই নেতাকর্মীদের টানা সহজ হতে পারে। জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল পাসের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় দলটির অনেক নেতাকর্মীকে দলে টানা আরও সহজ হবে বলে তারা মনে করছেন।
গত ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল ২০২৬ পাস হয়, যার মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। এর আগে গত বছর ১২ মে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। পরে নির্বাচন কমিশন থেকে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করা হয়। এই অধ্যাদেশটি সংসদে বিল আকারে পাস হওয়ার মাধ্যমে তা আইনে পরিণত হয়েছে।
গত নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারবে--, এমন একটি আলোচনা তৈরি হয়েছিল। এমনকি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যেও এক ধরনের আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু জাতীয় সংসদে কার্যক্রম নিষিদ্ধের অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত হওয়ার পর সেই আশা ভেঙে যায়। এই হতাশা থেকেও কেউ কেউ অন্য দলে যাওয়ার সুযোগ পেলে তা গ্রহণ করতে পারেন।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটির অনেক নেতাকর্মী অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। কেউ কেউ সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকছেন, আবার কেউ নতুন প্ল্যাটফর্ম খুঁজছেন। এই পরিস্থিতিতে বিএনপি ও এনসিপির আহ্বান তাদের কাছে নতুন সুযোগ হিসেবে দেখা দিতে পারে।
তবে আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এ ধরনের কোনো চিন্তা নেই। বরং তারা সংকটের সময়ে ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত থাকার চেষ্টা করছেন। কেউ গেলে যেতে পারে, তবে প্রকৃত আওয়ামী লীগের কর্মীরা দল ছাড়বেন না। গত ১৫ বছরে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে অনেকেই দলে এসেছিলেন এবং সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। তারা চলে গেলে দলের কোনো ক্ষতি হবে না, বরং এটি দলের জন্য ইতিবাচক হবে।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দলের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থাকার চেষ্টা করছেন, দলত্যাগের কোনো চিন্তা নেই। কেউ গেলে প্রকৃত আওয়ামী লীগের কেউ যাবে না; বরং সুযোগসন্ধানীরাই সরে যেতে পারে।
অতীতে ১৯৯০ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের দল জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদেরও বিভিন্ন দলে ভিড়তে দেখা গেছে। জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের নিয়েও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল টানাটানি শুরু করেছিল। বিশেষ করে অনেকেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে যোগ দেন। দলগুলোও তাদের টানতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। জাতীয় পার্টির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা স্থানীয়ভাবে এই দুই দলে যুক্ত হয়ে পড়েন। এমনকি দলটির অনেক প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক মন্ত্রীও বিএনপি ও আওয়ামী লীগে যোগ দেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
আজকের সিলেট ডেস্ক 








