বালাগঞ্জ ফতুরখাড়া সেতু। ২৫ শতাংশ কাজেও হয়েছে মহা অনিয়ম। অনিয়মকারী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মালিকও দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা। দুর্নীতিগ্রস্থ জেনেও তাকেই কাজ দিয়েছেন সড়ক ও জনপথ (সওজ) কর্মকর্তারা। আর সওজ কর্মকর্তারা মিলেমিশে সেতুর কাজের বারোটা বাজিয়েছেন।
আওয়ামী লীগ-বিএনিপর যৌথ মালিকানা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের অনিয়মে সওজ কর্মকর্তারা সঙ্গী হয়েছেন আর্থিক সুবিধা নিয়ে। এই অসঙ্গতি উঠে এসেছে এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিবের তত্বাবধানে একটি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে এন্ট্রিগ্রেডিং টেস্ট করানোয়।
সওজ বলল, সেতুর কাজে পেরিয়ে গেছে এক বছরের বেশী সময়। শেষ হয়েছে ২৫ শতাংশ কাজ। এরই মধ্যে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান তুলে নিয়েছে সাড়ে ৫ কোটি টাকা। কাজ না করেই বাকি টাকা তুলে নেওয়ার পায়তারা করছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি। এই অবস্থা বালাগঞ্জ উপজেলার ফতুরখাড়া সেতুর কাজ অনিয়মের কারণে বন্ধ হয়ে আছে। ফলে উপজেলাবাসীর স্বপ্নের এই সেতুটি না হওয়ায় দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। ক্ষোভ তৈরী হচ্ছে জনমনে।
তবে দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান কাজ পেলেও বিষয়টি জানা নেই সওজ কর্তাদের। এই প্রতিষ্ঠানকে কাজ না দিতে সওজের কিছু কর্মকর্তা অনুরোধ করলেও সেটিও মানা হয়নি। উল্টো কাজ বাগিয়ে নিয়ে সেতুর কাজেও অনিয়ম করে ঠিকাদারী এই প্রতিষ্ঠান।
এদিকে ৫ আগষ্ট সরকার পরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের বিরুদ্ধে হয়েছে একাধিক মামলা। ফলে নতুন করে সেতুর কাজ শুরু নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
সেতু নির্মাণে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়ম থাকলেও সেটি মানতে নারাজ সিলেট সড়ক ও জনপথের (সওজ) কর্মকর্তারা।
তাদের মতে, সেতু নির্মাণে তেমন অনিয়ম হয়নি। বন্যারপানির কারনে কাজ বন্ধ রয়েছে। অথচ সওজ সিলেটের অতিরিক্ত প্রকৌশলী ফজলে রব্বে জানিয়েছিলেন, অনিয়মের কারণে সেতুর কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।
সওজ সূত্রে জানা গেছে, বালাগঞ্জের ফতুরখাড়া পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণে ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে দরপত্র আহ্বান করে সড়ক ও জনপথ (সওজ)। সিলেট সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. ফজলে রব্বে এই দরপত্র আহবান করেন।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির যৌথ মালিকানাধীন নেতার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স জনজেবি কনসট্রাকশন সেতুর কাজ পায়। দরপত্রের আলোকে ২০২৩ সালের ২৭ মে সিলেট-বালাগঞ্জ সড়কের ২১ তম কিলোমিটারে ৭৬ দশমিক ১ মিটার দৈর্ঘ্যের ফতুরখাড়া পিসি গার্ডার সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। সেতুর প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয় ১৬ কোটি ৪৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা। নির্মাণ কাজের তদারকি করেন সওজ সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী আমির হোসেন ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান।
স্থানীয়রা জানান, নিয়ম অনুযায়ী উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী এবং উপ-সহকারী প্রকৌশলী পাইল ঢালাই চলাকালীন সময়ে সরেজমিন উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ ৩২টি পাইল ঢালাইয়ে প্রকল্পের আশপাশেও কেউ ছিল না। কাজে অনিয়ম করতে দিনে না করে রাতে করা হয়েছে। ১৬ কোটি টাকার কাজ মাত্র ৮ কোটি টাকায় শেষ করতে মহা অনিয়ম করা হয়।
অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্রিজের প্রতিটি পিলারে চারটি খাঁচা বসানোর কথা থাকলেও ৩টি করে খাঁচা দেওয়া হয়েছে। নকশা অনুযায়ী, সেতুর ৪৫ মিটার করে ৩২টি পাইল করার কথা। অথচ বেশিরভাগ পাইল ২৪ মিটার আবার কোনটি ৩৬ মিটারে করা হয়েছে।
পাথরের মানও ছিল নিম্নমানের ছিল বলে অভিযোগ এলাকার লোকজনের। ইতিমধ্যে সাড়ে ৫ কোটি টাকা তুলেও নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে কাজ না করে বাকি টাকা তুলে নেওয়ারও পায়তারা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে, এলাকার লোকজনের প্রতিবাদের মুখে সেতুর কাজের অনিয়ম দেখতে সিলেট-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান একটি বেসরকারি প্রকৌশলী সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত করান। তদন্তে অনিয়মের সত্যতাও মিলে। পরে সাবেক এই সংসদ সদস্য সওজ সিলেটের অতিরিক্ত প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী ও ঠিকাদার মিলে ফতুরখাড়া সেতু পরিদর্শন করেন। তিনি কাজের অনিয়ম পেয়ে সাময়িক বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।
পরবর্তীতে ঠিকাদার ও প্রকৌশলীরা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এমপির সঙ্গে বিষয়টির মীমাংসা করেন বলে জানা গেছে। তবে অনিয়মের কারনে এখনো সেতুর কাজ বন্ধ রয়েছে।
অন্য একটি সূত্র জানায়, ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরে মৌলভীবাজার-রাজনগর, সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ সড়কের ৭ টি কালভার্ট এবং এপ্রোচ সড়কের পিএমপি সড়ক কর্মসূচির আওতায় ডিবিএস ওয়ারিং কোর্স, ডিবিএস বেস কোর্স কাজের উম্মুক্ত টেন্ডার হয়। টেন্ডারে ওই কাজ পায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স জনজেবি কন্সট্রাকশন। প্রতিষ্টানের মালিক গোলাপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি লুৎফুররহমান। ওই কাজে নানা অনিয়ম করা হয়। কাজে ব্যাপক অনিয়ম করায় মামলা করে দূর্নীতি দমন কমিশন দুদক। জিআর মামলা নং ১২৮/২০১৮। মামলায় আসামি করা হয় সিলেট সওজের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মনিরুল ইসলাম, উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী তানভীর হোসেন. মো. মাসুম আহমদ, মো. আনোয়ার হোসেন, আবুল বরকত মো. খুরশীদ আলম ও মেসার্স জনজেবির পরিচালক লুৎফুর রহমানকে। বর্তমানে মামলাটি আদালতে চলমান।
এদিকে ৫ আগষ্টের পর ঠিকাদার লুৎফুর রহমানের বিরুদ্ধে হত্যাসহ বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। তার মোবাইল ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যায়।তিনি আত্মগোপনে আছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ৫ আগষ্টের আগে লুৎফুর রহমানের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হলে তখন তিনি সেতুর কাজে কোনো দুর্নীতি-অনিয়ম হয়নি, নকশা অনুযায়ী সেতুর কাজ করেছেন বলেও জানান।
আর সেতুর কাজে অনিয়মের ঘটনায় ঠিকাদারের পক্ষে সাফাই গাইলেন সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী আমির হোসেন।
তিনি বলেন, ফতুরখাড়া সেতুতে অনিয়ম হয়নি। যে প্রকৌশলী প্রতিষ্ঠান সেতুর উন্নয়ন কাজের অনিয়ম যাঁচাই করেছে, তারা সঠিকভাবে করতে পারেনি। যাচাই করতে হলে সেতুর কিছু অংশ ভেঙ্গে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার কথা থাকলেও সেটি করা হয়নি। তারা পরীক্ষা করে কোন ব্যবস্থা নেবেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটির প্রয়োজন নেই।
রাতে কাজ করার বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক সময় মেশিন নষ্ট হওয়ার কারণে হয়তো রাতে কাজ করতে পারে। তবে রাতে কাজ করার কোনো নিয়ম নেই। প্রথমে অনিয়মের কারণে কাজ বন্ধ ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে বন্যার পানির কারণে কাজটি বন্ধ রয়েছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে কাজ চলমান রাখার বিষয়ে বলেন, ওই প্রতিষ্ঠান করতে না পারলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রহমতপুর এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন আকবর বলেন, সেতুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ব্যাপক অনিয়ম করেছে। রাতের অন্ধকারে কাজ করেছে। পাইলিংয়ে খাঁচার গভীরতা কম দেওয়ায় সেতুটি দুর্বল ও টেকসই হবে না। যান চলাচল শুরু হলে সেতুটি ভেঙে পড়তে পারে।
স্থানীয় গহরপুর এলাকার বাসিন্দা মাওলানা আনিসুর রহমান বলেন, সেতুর অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর স্থানীয়রা বিভিন্নভাবে তদারকি শুরু করেন। অন্ধকারে ঢালাইর কাজ ও পাইলের গভীরতা কম দেওয়া বিষয়ে অবগত করলেও কর্মকর্তারা কোন ব্যবস্থা নেননি। সেতুর কাজ টেকসই হওয়ার পরিবর্তে আমার মনে হয় অনেক দূর্বল হয়েছে। আমরা এলাকাবাসী অনিয়মের প্রতিবাদ জানিয়েছি। সাবেক এমপি কাজ বন্ধ করেছিলেন। পরে কিভাবে কাজ শুরু হয়ে আবার বন্ধ হল সেটি আমাদের জানা নেই। এটি শেষ না হওয়া মারাত্মক দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
অতিথি প্রতিবেদক 








