সিলেটে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়, সেই সাথে বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান জড়িত সিলেটের সবক’টি পাথর কোয়ারীতে। পাথরকোয়ারীগুলো ছিল সিলেটের স্থানীয় অর্থনীতির মজুবত ভিত্তি। সেই কোয়ারী গুলো বন্ধ করে দেয়া হয় দেশের কতিপয় লুটেরা শিল্পগোষ্টির স্বার্থে। সেই বন্ধের অজুহা হিসেবে তোলা হয় পরিবেশ ধ্বংসের। একই সাথে বন্ধের প্রক্রিয়াকে আইনী প্রলেপ দিতে পরিবেশ আইনবীদ সংস্থা (বেলা) মামলা করে বসে।
মামলার কারনে দীর্ঘ ৫/৬ বছর ধরে কোয়ারী থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ বন্ধের বৈধতা নিয়ে নেয় শিল্পগোষ্টির স্বার্থের পুজারী দায়িত্বশীল সংশ্লিষ্টরা। অথচ পাশ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে পাথর উঠছে, সেই পাথর আমদানী করছে বাংলাদেশে। পাথর তুলতে ভারতের পরিবেশ নষ্ট হয় না, কেবল যেন নষ্ট হয় বাংলাদেশের। এ যেনে ‘মাথা ব্যাথার জন্য মাথা কাটা’। পাথর কোয়ারী বন্ধের ঘটনা সিলেটের স্থানীয় অর্থনীতির জন্য বিশাল এক ধাক্কা। বেলার মামলার ঘোষিত রায়ের পর পাথর কোয়ারী বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন ছিল এক পায়ে খাঁড়া, পরবর্তীতে সেই পাথর কোয়ারীগুলো থেকে সনাতনী প্রদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের জন্য আদালতের একাধিকবার নির্দেশনা আসলেও তা বাস্তবায়নে কোন পদক্ষেপ নিতে আগ্রহ দেখায়নি সংশ্লিষ্টরা। যেভাবেই হোক শিল্পগোষ্টির তাবেদারী করবে তারা। পাথর কোয়ারী খুলে দেয়ার দাবীতে হরতাল, পরিবহন ধর্মঘট, মিছিল সমাবেশ, মানববন্ধন সহ কর্মসূচীর পর কর্মসূচী পালন করেছেন ভোক্তভোগীরা, কিন্তু কিছুতেই নড়েনি সংশ্লিষ্টরা।
অথচ সনাতন পদ্ধতিতে পাথর কোয়ারী খুলে দেয়ার দাবীতে গত ২০২২ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে সিলেটে ৪৮ ঘন্টার পরিবহণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল সিলেট বিভাগীয় ট্রাক পিকআপ কার্ভাডভ্যান মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। এমনকি তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের মন্ত্রী ও স্থানীয় এমপি-ইমরান আহমদ ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পাথর কোয়ারী খুলে দেয়ার জন্য সুপারিশ করেছিলেন, কিন্তু তাতে কোন পদক্ষেপ নেয়নি শিল্পগোষ্টির চাটুকাররা।
এদিকে ২০২২ সালে বিশ্ব পর্যটন দিবসের এক গোলটেবিল বৈঠকে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ড. মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বলেন, সিলেটের কোয়ারিগুলো থেকে এখন কোন পাথর উত্তোলন করতে দেয়া হবে না। পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে এখানকার পরিবেশ ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। এছাড়া অনেক শ্রমিকের প্রাণহানি হয়েছে। বিভাগীয় কমিশনার বলেন, বিভিন্ন পক্ষ থেকে পাথর উত্তোলনের দাবি আছে। এনিয়ে পরিবেশ কর্মীদের চাপও আছে। তবে আমি পাথর উত্তোলন শুরু না করার পক্ষে। এভাবে সরকারের দায়িত্বশীলরা দানবীয় শিল্পগোষ্টির পুতুলে পরিণত হয়ে স্থানীয় মানুষের টেকসই অর্থনীতি ও তাদের জীবিকার খাত বেকার হয়েছেন প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক। মানবেতর জীবনযাপন করছেন কোয়ারির সাথে জড়িত পাথর ও পরিবহন ব্যবসায়ী, বেলচা, বারকি, পরিবহন ও লোড-আনলোড শ্রমিকরা। ২০২২ সালের ৩১ মে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগে পাথর কোয়ারিগুলো খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর চার মাস পর ডিও লেটার দেন স্থানীয় সংসদ সদস্য, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ। কিন্তু সিদ্ধান্তের পর প্রায় ২ বছরে বেশি সময় পার হলেও খুলে দেয়ার ব্যাপারে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত হয়নি।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভোলাগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, বিছনাকান্দি, লোভাছড়া, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, শ্রীপুরসহ প্রায় ১০-১২টি পাথর খনি রয়েছে। যেখান থেকে দেশের চাহিদা মেটাতে ১ কোটি টন পাথর উত্তোলন করা সম্ভব। কিন্তু ২০১৮ সাল থেকে সিলেট অঞ্চলের সবকটি কোয়ারি থেকে বন্ধ রয়েছে পাথর উত্তোলন। এর ফলে কোয়ারি নির্ভর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে।
স্থানীয় সূত্র মতে, ভোলাগঞ্জ, বিছনাকান্দি, জাফলং এবং লোভাছড়া পাথর কোয়ারীগুলো থেকে স্বাধীনতা উত্তর কাল থেকে সারা দেশের পাথর সরবরাহ করা হয়ে আসছিল। প্রায় ১৫ লাখ ব্যবসায়ী-শ্রমিক ও পরিবহণ মালিক-শ্রমিক এ পাথর ব্যবসার সাথে জড়িত।
কিন্তু দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর ধরে কোয়ারী বন্ধ থাকার কারণে সিলেটের পরিবহণ খাত বিশেষ করে ট্রাক মালিক ও শ্রমিকদের ব্যবসায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অধিকাংশ ট্রাক মালিক ব্যাংক ঋণ নিয়ে অথবা কোম্পানীগুলোর কাছ থেকে কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের শর্তে তাদের গাড়ী কিনেছেন। গত ৬ বছর ধরে কোয়ারী বন্ধ থাকার কারণে ট্রাক মালিকদের পণ্য পরিবহনে ভাটা পড়ে। অনেক মালিক ঋণের কিস্তি দিতে না পেরে ইতোমধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকেই ব্যাংক ঋণে জর্জরিত হয়ে চরম আর্থিক সংকটে নিপতিত হয়েছেন। প্রায় ৫০ হাজার ট্রাক শ্রমিক পরিবার পরিজন নিয়ে দুঃসহ জীবন যাপন করছেন। পাথর পরিবহণ বন্ধ থাকায় শত শত ট্রাক মালিক, স্টোন ক্রাশার মালিক ও ব্যবসায়ী ব্যাংক ঋণে জর্জরিত হয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় দিন যাপন করছেন। যদিও সনাতন পদ্ধতিতে পাথর কোয়ারী খুলে দেওয়ার জন্য মাননীয় হাইকোর্ট একাধিক বার নির্দেশনা দেয়। অথচ, পাথর কোয়ারী বন্ধ রেখে বিদেশ থেকে রিজার্ভের ডলার খরচ করে পাথর আমদানী করে উন্নয়ন কাজ চালানো হয়। ফলে রাষ্ট্রীয় রিজার্ভ সংকটে নিপতিত হয়েছে। লাখো মানুষের জীবন রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় রিজার্ভের ডলার সাশ্রয়ের জন্য সিলেটের পাথর কোয়ারী জরুরী ভিত্তিতে খুলে দেয়ার দাবী তোলা হয়।
এদিকে, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, ছাতক, তাহিরপুর, কানাইঘাটে সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার ক্রাশার মিল বন্ধ। পাথর উত্তোলন বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে সেই মিলগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। যেসব ব্যবসায়ী আগে থেকেই আমদানি-রফতানির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তাদের অনেকে জড়িয়ে পড়েন পাথর আমদানিতে। তামাবিল স্থলবন্দরসহ সিলেটের সব শুল্ক স্টেশন দিয়ে শুরু হয়েছে ভারত থেকে পাথর আমদানি। আমদানি করা বোল্ডার (বড়) পাথর ভেঙে কোনো রকমে জীবিকা নির্বাহ করার চেষ্টা করছিলেন মিল মালিকরা। একই সঙ্গে পাথর কোয়ারি খুলে দেয়ার দাবিতে বৃহত্তর সিলেট পাথর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা ঐক্য পরিষদের ব্যানারে নানা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
বৃহত্তর সিলেট পাথর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের নেতা শাব্বির আহমদ বলেন, এমনিতেই কোয়ারি বন্ধ থাকায় মিল চলছে না। আমদানি করা বোল্ডার পাথর ভেঙে কোনো রকমে তাদের চলছিল। এর মধ্যে কিছু আমদানিকারক বিদেশ থেকে ভাঙা পাথর আনছেন। এতে মিল মালিকরা পথে বসার উপক্রম।
এদিকে, ২০২২ সালের ২৫ ডিসেম্বর সিলেটের বন্ধ থাকা পাথর কোয়ারি চালুর দাবি জানিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদকে আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ। তার নির্বা এলাকাতেই জাফলং, ভোলাগঞ্জ, বিছনাকান্দি, শ্রীপুরসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ পাথরকোয়ারিগুলোর অবস্থান। ডিও লেটারে অসহায় ও দরিদ্র শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ সনাতন পদ্ধতিতে স্থানীয় শ্রমিকদের দিয়ে কোয়ারি থেকে পাথর তোলার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ডিও লেটারে সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমদ লিখেছিলেন, কোয়ারিগুলো থেকে দীর্ঘকাল ধরে পাথর উত্তোলন অব্যাহত থাকলেও সরকারি নির্দেশনায় কয়েক বছর ধরে তা বন্ধ আছে। বন্ধের আগে দীর্ঘদিন ধরে কোয়ারিগুলো সচল থাকায় এলাকার বেশির ভাগ মানুষ কোয়ারি সংশ্লিষ্ট কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। বেশ কয়েক বছর কোয়ারি বন্ধ থাকায় হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান বন্ধ হওয়ায় তাঁরা বেকার হয়ে পড়েছেন বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, কোয়ারিগুলো ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত হওয়ায় প্রতিবছর পাহাড়ি ঢলের কারণে উজান থেকে প্রচুর পানি নেমে আসে। কয়েক বছর কোয়ারি বন্ধ থাকায় ও পাথর উত্তোলন না করায় বর্তমানে অনেক পাথর নদীর প্রবেশমুখে স্তুপাকারে আটকে আছে। নদীর প্রবেশমুখে পাথরের স্তুপ থাকায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে বলে মন্ত্রী ইমরান আহমদ ডিও লেটারে দাবি করেছিলেন। তিনি আরও লিখেছেন, নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হওয়ায় জাফলং কোয়ারির পাশে খাসিয়াপুঞ্জি, বিছনাকান্দি কোয়ারির পাশে বগাইয়া, ভোলাগঞ্জ কোয়ারির কালাইরাগ, কালাসাদক মৌজাসহ নদীর আশপাশের গ্রামে ভাঙন দেখা দিয়েছে এবং এলাকাগুলো নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
পাথরকোয়ারির প্রবেশমুখগুলো উন্মুক্ত করার জন্য পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে পাথর উত্তোলনের অনুমতি দিলে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধিসহ নদীর পানি প্রবাহ ঠিক থাকবে বলে সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমদ দাবি করেন। তিনি বলেছিলেন, দীর্ঘদিন কোয়ারি বন্ধ থাকায় ও বেকারত্ব বাড়ায় এলাকার মানুষের মধ্যে অস্থিরতা, অসহায়ত্ব ও হতাশা বাড়ছে। তাঁরা বিভিন্ন অনৈতিক ও অসামাজিক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। এতে সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি হচ্ছে। তিনি আরও লিখেন, বর্তমান অবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পাথর আমদানি হ্রাস পেয়েছে। নির্মাণসামগ্রীর অন্যতম উপকরণ পাথরের দাম দিন দিন বাড়ছে। ফলে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে এবং বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলনের অনুমতি দিলে এক দিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
আজকের সিলেট/ডি/এপি
আহমেদ পাবেল 








